"লাইটার(lighter)” পড়ুন, অতীতকে ছেড়ে সম্ভাবনাকে স্পর্শ করুন!

"লাইটার(lighter)” পড়ুন, অতীতকে ছেড়ে সম্ভাবনাকে স্পর্শ করুন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ক্লান্তি এখন আর শুধু আমাদের শরীরের নয়, ক্লান্তি জমে থাকে আমাদের অন্তরে। অপ্রকাশিত দুঃখ, না বলা কথা, পুরোনো ভুল, সম্পর্কের টানাপোড়েন-সব মিলিয়ে আধুনিক মানুষ যেন প্রতিদিন অদৃশ্য এক বোঝা বয়ে বেড়ায়। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সেই ভার ধীরে ধীরে মনকে ভারী, শ্বাসকে অগভীর আর জীবনকে জটিল করে তোলে। ঠিক এই অদৃশ্য বোঝা নামানোর কথাই বলে “Lighter”। এটি একটি আধুনিক আত্মসহায় বই, যা শান্ত কণ্ঠে পাঠককে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়। এই বইয়ের মূল আকর্ষণ এখানেই। এটি জীবনের সব সমস্যার দ্রুত সমাধান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় না। বরং ধীরে, সচেতনভাবে, নিজের মানসিক ভার চিনে নেওয়া এবং তা নামিয়ে রাখার এক বাস্তবসম্মত পথ দেখায়।

Lighter এর লেখক ইয়ং পুয়েবলো (Yung Pueblo)(আসল নাম Diego Perez) একজন লেখক ও ধ্যানচর্চাকারী, যিনি নিজের জীবন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই বইটি গড়ে তুলেছেন। বইটি আত্মজীবনীধর্মী না হলেও লেখকের ব্যক্তিগত মানসিক যাত্রা ও অন্তর্দৃষ্টি থেকে তার শিক্ষা পাঠকের জন্য বহুদূর প্রসারিত হয়। 

ইয়ং পুয়েবলো মনে করেন যে, আমরা যত বেশি নিজেকে নিরাময় করব, আমাদের কাজগুলি ততবেশি ইচ্ছাকৃত হয়ে উঠবে, আমাদের সিদ্ধান্তগুলি আরও সহানুভূতিশীল হবে, আমাদের চিন্তাভাবনাও আরো স্পষ্ট হবে এবং ভবিষ্যত হবে আরও উজ্জ্বল।

বইটির মূল ভাবনা: 

বেশিরভাগ আত্মসহায়ক বইয়ের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো- নেতিবাচকতা এড়িয়ে চলা, সব সময় ইতিবাচক ভাবা এবং কষ্ট ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া। “Lighter”বইটি এই জায়গায় ভিন্ন রকম। “Lighter” পাঠককে  মানসিক ও আধ্যাত্মিক পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন পর্যন্ত নিয়ে যায়। এই বই বলে না যে আপনাকে অতীত ভুলে যেতে হবে, কষ্ট চাপা দিতে হবে বা অনুভূতিগুলো অস্বীকার করতে হবে।বরং বইটির মূল বক্তব্যই হলো, যা বহন করা দরকার নেই, তা বহন করতে থাকাই মানসিক ভারের প্রধান কারণ। অতীতের অভিজ্ঞতা, ব্যথা বা ভুল জীবনেরই অংশ। কিন্তু সেগুলো যদি বর্তমানকে আটকে রাখে, সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে এবং ভবিষ্যৎকে ভয়ের জায়গা বানিয়ে ফেলে, তাহলে সেগুলো আর শিক্ষা থাকে না। সেগুলো আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। “Lighter” পাঠককে শেখায়। 

বইটি যেসব মূল ধারণা নিয়ে কাজ করে তা হলো:

১. নিজেকে বন্ধু বানানো। আমরা প্রায় সময়ই  নিজের প্রতি কঠোর হই। নিজের ভুল, ব্যর্থতা এবং অনিশ্চিত সময়গুলোকে দমন করে রাখি। বইটি শেখায়, নিজেকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখা। এ দৃষ্টিভঙ্গি  মানসিক ভার কমাতে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকর। 

২. অতীতকে সরলভাবে না ভুলে, বরং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া! যে ভুলগুলো আমাদের মানসিক ভার বাড়িয়েছে, সেগুলোকে দমন করার বদলে গভীরভাবে বোঝার মাধ্যমে মুক্তি পাওয়াই বইটির অন্যতম লক্ষ্য। এর ফলে আমরা আগামীতে আরও বুদ্ধিমত ও মনোযোগ সহকারে জীবন গড়তে পারি। 

৩. গ্রন্থটি বারবার বলে, বর্তমানের অনুভবগুলোতে মনোনিবেশ করলে অতীতের ভার চরমভাবে হালকা হয়। এর ফলে আমরা দীর্ঘায়িত উদ্বেগ ও চিন্তা থেকে দীর্ঘমেয়াদি মুক্তি পেতে পারি। 

৪. বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্পর্ক। অনেক সময় মানুষ সম্পর্কের দায়, প্রত্যাশা আর অপরাধবোধ বহন করতে করতে নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। “Lighter” বলে, সব সম্পর্ক রক্ষা করা মানেই সুস্থ থাকা নয়। এখানে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আহ্বান নেই, তবে সীমা নির্ধারণের গুরুত্ব ফুটে উঠেছ। কোথায় ‘না’ বলা দরকার, কোথায় নিজের জায়গা ধরে রাখা প্রয়োজন, সেই বোঝাপড়াই সম্পর্ককে হালকা ও সুস্থ করে। 


কেন বইটি অনেকের কাছে কার্যকর মনে হয়?

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভাষা। জটিল মনোবৈজ্ঞানিক পরিভাষা বা ভারী দার্শনিক বাক্যের আশ্রয় না নিয়ে, লেখক সাধারণ কথাবার্তার ভঙ্গিতে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। মনে হয় যেন কেউ পাশে বসে ধীরে ধীরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছে। নেই কোনো জোর , নেই কোনো চাপ। প্রতিটি অধ্যায় ছোট ছোট অনুচ্ছেদে বিভক্ত। কোথাও দীর্ঘ ব্যাখ্যার ভার নেই, আবার কোথাও অপ্রয়োজনীয় আবেগপ্রবণতাও অনুভূত হয় না। এই সাবলীল ভঙ্গিই বইটিকে পড়তে সহজতর করে তোলে, বিশেষ করে সেই পাঠকদের জন্য, যারা মানসিকভাবে ইতিমধ্যেই ক্লান্ত।

সীমাবদ্ধতা: 

পরিবেশ, সমাজ, অবস্থান, পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিভেদে এই বইয়ের প্রভাব সবার জন্য সমান গভীর কিংবা প্রাঞ্জল পথনির্দেশ নাও দিতে পারে। কিন্তু যারা নিজের অন্তর্লোককে খুঁজে দেখতে প্রস্তুত, তাদের জন্য “Lighter” হতে পারে এক অনুপ্রেরণাদায়ক মানসিক পথপ্রদর্শক। যারা সরাসরি সমস্যা সমাধানের ধাপ, তালিকা বা কাঠামোবদ্ধ নির্দেশনা খোঁজেন, তারা বইটিকে কিছুটা বিমূর্ত মনে করতে পারেন। এখানে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার বিশদ বিশ্লেষণ নেই, নেই পরিসংখ্যানের ভার। বইটি মূলত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে। ফলে যারা খুব বাস্তবভিত্তিক বা ক্লিনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি চান, তাদের কাছে বইটি ধীর মনে হতে পারে।

কার জন্য এই বইটি উপযোগী?

এই বই বিশেষভাবে উপযোগী তাদের জন্যই, যারা অতীতের কারণে মানসিক ভার অনুভব করেন, নিজের সঙ্গে কঠোর আচরণ করেন, সম্পর্কের ক্লান্তি বয়ে বেড়াচ্ছেন,তাছাড়া যারা ধীরে, সচেতনভাবে নিজেকে বোঝার চেষ্টা করতে চান তাদের ক্ষেত্রে বইটি কার্যকর হতে পারে। এটি দ্রুত সমাধানের বই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সচেতনতার সহযাত্রী।

“Lighter” শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ কিন্তু গভীর বার্তা দেয় আর তা হলো,
হালকা হওয়া মানে দুর্বল হওয়া নয়, হালকা হওয়া মানে অপ্রয়োজনীয় ভার নামিয়ে শক্তভাবে দাঁড়ানো।
 

সম্পর্কিত নিউজ