এক রান্নাযতেই মন জয় করুন শ্বশুরবাড়ির সবার! চিংড়ি-মালাইকারির অভিজাত রেসিপি

এক রান্নাযতেই মন জয় করুন শ্বশুরবাড়ির সবার! চিংড়ি-মালাইকারির অভিজাত রেসিপি
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

বাঙালি রান্নার ইতিহাসে এমন কিছু পদ আছে, যেগুলো কেবল খাবারই নয় একেকটা আবেগ, সংস্কৃতি। চিংড়ি মালাইকারি ঠিক তেমনই এক ব্যতিক্রমী পদ, যেখানে স্বাদ আর পুষ্টি হাত ধরাধরি করে চলে। নারকেল দুধের মোলায়েমতা, চিংড়ির স্বাভাবিক মিষ্টতা আর মসলার ভারসাম্য মিলিয়ে এই রান্না বাংলার রন্ধনশৈলীর এক অনন্য পরিচয় বহন করে। শুধু উৎসব বা বিশেষ দিনের খাবার হিসেবেই নয়, চিংড়ি মালাইকারি দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালি রসনায় রাজকীয় পদ এক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এর স্বাদ যেমন অনন্য, তেমনি এর পুষ্টিগুণও কম নয়। বিশেষ করে প্রোটিনসমৃদ্ধ চিংড়ি আর স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস নারকেল দুধ, এই দুইয়ের সংমিশ্রণ খাবারটিকে করে তোলে সুস্বাদু ও একই সাথে শক্তিদায়কও ।

চিংড়ি মালাইকারি মূলত উপকূলীয় বাংলার রান্নাঘর থেকে উঠে আসা একটি সমাদৃত পদ। সমুদ্রঘেঁষা অঞ্চলে চিংড়ি সহজলভ্য হওয়ায় এটি ধীরে ধীরে বিশেষ আয়োজনের খাবারে পরিণত হয়। নারকেল দুধ ব্যবহারের প্রবণতাও এই অঞ্চলের রান্নায় বহু পুরোনো। এই রান্নার বৈশিষ্ট্য হলো মসলার ঝাঁঝ কম, থাকবে কিন্তু স্বাদের গভীরতা হবে বেশি। এখানে  নারকেল দুধ ও হালকা মসলার সাহায্যে চিংড়ির আসল স্বাদকে আরও স্পষ্ট করে তোলা হয়। এ কারণেই চিংড়ি মালাইকারি অন্যান্য ঝাল তরকারির তুলনায় অন্যরকম এক মর্যাদা পায়।

পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের মানুষের কাছে চিংড়ি বেশ  জনপ্রিয় একটি খাদ্য। দেশে দেশে তো রয়েছেই, বিদেশেও চিংড়ির ভালো বাজার রয়েছে। চিংড়ি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি। চিংড়ি রপ্তানি করে প্রতি বছর বহু কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হয়। চিংড়ি চাষ  আমিষ খাদ্যের অন্যতম উৎস। একসময়  আমাদের দেশে বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল, উপকূলীয় অগভীর এলাকা ও গভীর সাগর থেকে চিংড়ি সংগ্রহ করে তা বাজারজাত করা হতো। ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারে চিংড়ির  চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার চিংড়ি চাষের প্রতি আলাদা দৃষ্টি দেয়। বর্তমানে এর চাষ,  উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

চিংড়ি মালাইকারির উপকারিতা :
চিংড়ি প্রাকৃতিকভাবে উচ্চমাত্রার প্রোটিনের উৎস। এতে থাকা প্রোটিন শরীরের পেশি গঠন, কোষ মেরামত ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি চিংড়িতে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায়ও ভূমিকা রাখে। 

অন্যদিকে নারকেল দুধে থাকে স্বাস্থ্যকর চর্বি, যা শরীরকে দীর্ঘ সময় শক্তি জোগায়। এটি হজমে তুলনামূলকভাবে সহজ এবং রান্নায় মোলায়েমতা আনে। এই দুই উপাদানের সংমিশ্রণেই চিংড়ি মালাইকারি হয়ে ওঠে এমন এক পদ, যা স্বাদ ও পুষ্টি, দুই দিক থেকেই পরিপূর্ণ।

উপকরণ:
১। মাঝারি বা বড় আকারের তাজা চিংড়ি

২। ঘন নারকেল দুধ

৩। পেঁয়াজ কুচি

৪। আদা বাটা

৫। রসুন বাটা

৬। হালকা মরিচ বাটা

৭। হলুদ গুঁড়া

৮। সামান্য লবণ

৯। তেজপাতা

১০। দারুচিনি ও এলাচ

১১। সরিষার তেল বা হালকা স্বাদের রান্নার তেল

উপকরণের পরিমাণ নির্ভর করে রান্নার পরিমাণ ও ব্যক্তিগত স্বাদের ওপর। তবে চিংড়ি মালাইকারির ক্ষেত্রে ‘কম মসলা, পরিমিত স্বাদ’ নীতিটাই সবচেয়ে কার্যকর।

পদ্ধতি:
চিংড়ি মালাইকারির স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করে চিংড়ি ঠিকভাবে প্রস্তুত করার ওপর। প্রথমে চিংড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হয়। চিংড়ির মাথা মাথা রাখা বা না রাখাটা ঐচ্ছিক, এটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত পছন্দ। তবে মাথা থাকলে ঝোলের স্বাদটা  আরও বৃদ্ধি পায়। 

পরিষ্কার করা চিংড়িতে সামান্য হলুদ ও লবণ মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দেওয়া যায়। এতে চিংড়ির স্বাভাবিক গন্ধ কমে এবং রান্নার সময় রং সুন্দর হয়। খুব বেশি সময় ভিজিয়ে রাখা উচিত নয়, এতে চিংড়ির গঠন নরম হয়ে যেতে পারে। চিংড়ি মালাইকারি রান্নায় তাড়াহুড়ো করা যায়না।  এটি এমন একটি পদ, যেখানে ধীর আঁচে রান্নাই মূল সূত্র।

প্রথমে কড়াইতে তেল গরম করে তেজপাতা, দারুচিনি ও এলাচ ফোড়ন দেওয়া হয়।এই ফোড়ন তেলে একটি সুগন্ধি এনে দেয়। এরপর পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ধীরে ধীরে ভাজা হয়, যতক্ষণ না পেঁয়াজ হালকা সোনালি রঙ ধারণ করে। এরপর আদা ও রসুন বাটা যোগ করা হয়। কাঁচা গন্ধ চলে যাওয়া পর্যন্ত কষাতে হয়। এই পর্যায়ে সামান্য হলুদ ও মরিচ বাটা যোগ করে মসলার ভিত্তি তৈরি করা হয়। খুব বেশি ঝাল না দেওয়াই এই রান্নার বৈশিষ্ট্য।

সবশেষে চিংড়ি দিয়ে অল্প সময় নেড়ে নেওয়া হয়, যাতে চিংড়ির রস বেরিয়ে আসে। এরপর ঢেলে দেওয়া হয় ঘন নারকেল দুধ। ঢাকনা দিয়ে কম আঁচে কিছুক্ষণ রান্না করলেই ঝোল ধীরে ধীরে মোলায়েম ও সুগন্ধি হয়ে ওঠে।

রান্নার সময় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি -
চিংড়ি বেশি সময় রান্না করলে শক্ত হয়ে যায়। তাই নারকেল দুধ দেওয়ার পর খুব বেশি সময় রান্না না করাটাই ভালো। ঝোল ঘন হয়ে এলে চুলা বন্ধ করাই উত্তম। লবণের পরিমাণ শুরুতেই কম রাখা ভালো। কারণ নারকেল দুধ ঘন হলে স্বাদ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। প্রয়োজনে শেষে সামান্য লবণ যোগ করা যেতে পারে।

চিংড়ি মালাইকারি সাধারণত সাদা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। ভাতের সাদামাটা স্বাদ নারকেল দুধের ঝোলকে আরও তুষ্ট করে। বিশেষ দিনের দুপুর বা রাতের খাবারে এই পদ আলাদা এক মাত্রা যোগ করে। অনেকে পোলাও বা বাসমতি ভাতের সঙ্গেও এটি পরিবেশন করেন। তবে যে ভাবেই খাওয়া হোক, এই রান্নার আসল মজা  তার মোলায়েম ঝোল আর চিংড়ির স্বাভাবিক স্বাদে।\

আজকের ব্যস্ত জীবনে যখন খাবার দ্রুত প্রস্তুত করার প্রবণতা বাড়ছে, তখন চিংড়ি মালাইকারি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু রান্না চায় সময়,চায়   মনোযোগ। আর সেই সময়টাই শেষ পর্যন্ত স্বাদের পার্থক্য গড়ে তোলে।

সম্পর্কিত নিউজ