ডিজিটাল ডিটক্স কি?কেন আপনার প্রয়োজন?

ডিজিটাল ডিটক্স কি?কেন আপনার প্রয়োজন?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। আমাদের অনেকেরই সকাল শুরুই হয় মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রেখে, দিন কাটে নোটিফিকেশন, মেইল আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে, আর রাত শেষ হয় আবার স্ক্রিনের আলোতেই। প্রযুক্তি এখন আমাদের সময়, মনোযোগ এমনকি আবেগও নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে যখন আমরা ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ি, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার উপর গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতায় ধীরে ধীরে উঠে আসছে একটি নতুন উপলব্ধি, ডিজিটাল ডিটক্স অথবা প্রযুক্তি থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিরতি নেওয়া।

প্রশ্ন হলো, এটি কি নিছক ট্রেন্ড, নাকি মানসিক সুস্থতার জন্য সত্যিই জরুরি?
ডিজিটাল ডিটক্স মানে প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন করা নয়। বরং সচেতনভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে নিজের মন ও স্নায়ুতন্ত্রকে বিশ্রাম দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। দ্রুতগতির ডিজিটাল জীবনে এই বিরতি কেন প্রয়োজন, তার উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ঢুকতে হয় মস্তিষ্ক, মনোযোগ এবং মানসিক চাপের গভীর আলোচনায়।

ডিজিটাল ডিটক্সের মাধ্যমে আমরা শুধু মানসিক শান্তি পুনরুদ্ধার করি না, পাশাপাশি আমাদের শারীরিক সুস্থতা, বিশেষত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করি। ডিজিটাল প্রযুক্তি যে আমাদের জীবন প্রতিনিয়ত সহজতর করছে তা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ  নেই।  যোগাযোগ, কাজ, বিনোদন সবকিছু একটি ক্লিকেই সম্ভব। কিন্তু একই সঙ্গে এই সুবিধাই তৈরি করেছে নানা রকম শারীরিক এবং অদৃশ্য মানসিক চাপ। মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে সীমিত সংখ্যক তথ্য প্রক্রিয়া করতে পারে। কিন্তু স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ও নিরবচ্ছিন্ন নোটিফিকেশন সেই সীমা প্রতিনিয়ত ভেঙে দিচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে মনোসংযোগের ঘাটতি, অকারণ অস্থিরতা, মেসেজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, মানসিক ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি। তবে এগুলো হঠাৎ দেখা দেয় না। ধীরে ধীরে জমতে থাকা ডিজিটাল চাপ থেকেই এই সমস্যাগুলো তৈরি হয়।  ডিজিটাল ডিটক্স এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের সাহায্য করতে পারে। 

ডিজিটাল আসক্তির পেছনে কাজ করে মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া। নতুন নোটিফিকেশন, লাইক বা মেসেজ পেলেই মস্তিষ্ক সাময়িক আনন্দের সংকেত পায়। এই সাময়িক আনন্দের অভ্যাসই ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে আরও বেশি স্ক্রিনের দিকে টেনে নেয়। এর ফলেই মানুষ স্ক্রিন থেকে দূরে থাকতে পারলেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। ডিজিটাল ডিটক্স মূলত এই অভ্যাসগত চক্র ভাঙার একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর উপায়।

মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে ডিজিটাল ডিটক্সের সম্পর্ক:
ডিজিটাল ডিটক্সের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মানসিক প্রশান্তিতে। স্ক্রিনের চাপ কমলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। এর কিছু বাস্তব প্রভাব হলো—

⇨ মনোযোগ বাড়ে
⇨ চিন্তার গতি ধীর হয়
⇨ অযথা দুশ্চিন্তা কমে
⇨ আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়

বিশেষ করে রাতে স্ক্রিন ব্যবহার কমালে ঘুমের মান উন্নত হয়, যা মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্ক ও যোগাযোগে পরিবর্তন:
অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা মানুষের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। একই ঘরে থেকেও মানুষ আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকে। কথা শোনার অভ্যাস হারিয়ে যায় এবং কথা বলাও কমে যায়। ডিজিটাল ডিটক্স এই জায়গায় একটি নীরব পরিবর্তন আনে। স্ক্রিন  টাইমিং কমলে মুখোমুখি কথা বাড়ে, সম্পর্ক গভীর হয়, আবেগ প্রকাশ সহজ হয়। মানুষ আবার বুঝতে শেখে, একটি বাস্তব কথোপকথন কোনো ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়ার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

কাজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা:
অনেকেই মনে করেন, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকলেই কাজ বেশি হবে। কিন্তু বাস্তবে  উল্টোটাই দেখা যায়। অতিরিক্ত ডিজিটাল বিভ্রান্তি কাজের গুণগত মান কমিয়ে দেয়। ডিজিটাল ডিটক্সের ফলে-

⇨ মনোযোগের স্থায়িত্ব বাড়ে
⇨ কাজ শেষ করার সময় কমে
⇨ সৃজনশীল চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়

মস্তিষ্ক যখন নিরবচ্ছিন্নভাবে তথ্যের চাপ থেকে মুক্তি পায়, তখনই নতুন ধারণা জন্ম নেয়।

ডিজিটাল ডিটক্স কি সবার জন্য প্রয়োজন?
ডিজিটাল ডিটক্স কোনো কঠোর নিয়ম না।এটি  একটি ব্যক্তিগত প্রয়োজন মাত্র। যারা দিনের বড় অংশ স্ক্রিনের সঙ্গে কাটান, তাদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা বেশি। বিশেষ করে-

⇨ মানসিক চাপ বেশি অনুভব করলে
⇨ ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে
⇨ অকারণে মন খারাপ বা বিরক্তি হলে
⇨ মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হলে

এই লক্ষণগুলো ডিজিটাল ক্লান্তির ইঙ্গিত হতে পারে।

ছোট অভ্যাসেই বড় পরিবর্তন!
ডিজিটাল ডিটক্স মানেই কয়েকদিন ফোন বন্ধ করে সমুদ্রে বা পাহাড়ে চলে যাওয়া নয়। ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই পরিবর্তন শুরু করা যায়। যেমন-

⇨ খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা
⇨ ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করা
⇨ দিনে নির্দিষ্ট সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা
⇨ সপ্তাহে কিছু সময় প্রযুক্তিমুক্ত থাকা

এই ছোট বিরতিগুলোই মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে ফেরায়।

ডিজিটাল ডিটক্স প্রযুক্তির বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন নামা নয়,বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা। প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু তা যেন মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে না নেয় এই সচেতনতাই মূল কথা। আধুনিক পৃথিবীতে প্রযুক্তি ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু প্রযুক্তির অতিরিক্ত দখলও সমানভাবে ক্ষতিকর। আর এই দুইয়ের মাঝামাঝি জায়গাটিই হলো ডিজিটাল ডিটক্সের দর্শন।

ডিজিটাল ডিটক্স আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সবসময় সংযুক্ত থাকাই সুস্থতার চিহ্ন নয়। কখনো কখনো বিচ্ছিন্ন হওয়াই প্রয়োজন, নিজের ভেতরের শব্দগুলো শোনার জন্য। স্ক্রিন থেকে চোখ সরালে দেখা যায় আকাশ, শোনা যায় মানুষের কথা, অনুভব করা যায় নিজের শ্বাস। প্রযুক্তির এই যুগে মানসিক প্রশান্তি কোনো বিলাস নয়-এটি একটি প্রয়োজন। আর সেই প্রয়োজন পূরণের নীরব পথই হলো ডিজিটাল ডিটক্স।

সম্পর্কিত নিউজ