দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকাই কেন এদের কৌশল?

দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকাই কেন এদের কৌশল?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

গভীর সবুজ রেইনফরেস্টে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে তবেই চোখে পড়ে তাদের। গাছের ডাল আঁকড়ে ঝুলে থাকা প্রাণীটি এতটাই ধীর যে অনেক সময় তাকে পাতারই অংশ বলে মনে হয়। কিন্তু হঠাৎ নড়েচড়ে উঠলেই বোঝা যায়, এটি পাতার অংশ নয় বরং স্লথ! পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির স্তন্যপায়ী হিসেবে পরিচিত এই প্রাণী দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকে। প্রশ্ন জাগে, এটা কি নিছক অলসতা নাকি এর পেছনে আছে কোনো গভীর ব্যাখ্যা?

বিজ্ঞান বলছে, স্লথের এই অদ্ভুত ঘুমপ্রবণ জীবনযাপন মোটেও দুর্ঘটনাজনিত নয়। বরং এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এক অসাধারণ কৌশল।

স্লথএক প্রকার স্তন্যপায়ী বৃক্ষচারি জীব। এরা সচরাচর দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার ক্রান্তীয় বনাঞ্চলের বাসিন্দা। ইংরেজি sloth কথাটি এসেছে slouthe থেকে,যার অর্থ অলস বা ধীর। এরা অনেক বেশি ধীরে নড়াচড়া ও চলাফেরা করে তাই এদের নাম দেওয়া হয়েছে স্লথ বা অলস। এদের বিপাক ক্রিয়া খুব ধীরগতিতে হয়। এরা বাজ জাতীয় শিকারি পাখির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবুজ সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এবং  নড়াচড়া করেনা বল্লেও চলে। এদের দেহ ঘন লোমে আবৃত থাকে এই কারণে ক্রান্তীয় বর্ষাবনের ভেজা আবহাওয়ার ফলে এদের শরীরে মথ, গুবরে পোকা, কৃমি, ফাংগি এবং উকুন ইত্যাদি পরজীবী প্রাণী আবাসস্থল গড়ে তোলে ।

স্লথ মূলত গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। পাতা সহজলভ্য কিন্তু পুষ্টির দিক থেকে খুবই দুর্বল। এতে প্রোটিন, ক্যালরি কম থাকে, আবার হজম করাও বেশ কঠিন। যেসব প্রাণী ফল, মাংস বা শস্য খায়, তারা সহজেই শক্তি পায়। কিন্তু স্লথকে সেই সামান্য শক্তিকেই অত্যন্ত হিসেব করে ব্যবহার করতে হয়।

এ কারণেই তাদের দেহ এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে, যাতে শক্তির অপচয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। কম নড়াচড়া, কম চলাফেরা, কম জেগে থাকা সবই তাদের শক্তি সাশ্রয়েরই অংশ। দিনে বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকা স্লথের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।

কিছু কিছু স্লথ দিনে মাত্র ৪০ মিটার পথ চলে। অর্থাৎ ঘন্টার পর ঘন্টা কাঠিয়ে দেয় প্রায় অনড় অবস্থাতেই । গাছের চেয়ে মাটিতে এদের গতি আরও বেশি কম। এরা একমিনিট হাত-পা নাড়ালে, মোটামুটি ৪ মিটার পর্যন্ত এগোতে পারে এবং এটাই এদের সর্বোচ্চ গতিসীমা। যে কোনো শিকারি প্রাণীর তুলনায় যা খুবই সামান্য। বিজ্ঞানীদের মতে, স্লথের ধীরগতির পেছনের একটা বড় কারণ হলো, তাদের খাদ্যাভাস।

স্লথের শরীরের ভেতরের কাজকর্ম, অর্থাৎ বিপাকক্রিয়া, অন্য যেকোনো স্তন্যপায়ীর তুলনায় অত্যন্ত ধীর। তারা যা খায়, তা হজম হতে সময় লাগে কয়েক দিন থেকে শুরু করে কখনো কখনো এক সপ্তাহেরও বেশি। এই ধীর বিপাকের ফলে তাদের শরীরকে খুব অল্প শক্তিতেই চলতে হয়। আর সেজন্যই তাদের জীবনযাপনও ধীর। বেশি সময় জেগে থাকলে শরীরের শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। তাই ঘুম তাদের জন্য এক ধরনের শক্তি সঞ্চয়ের কৌশল।

অন্য স্তন্যপায়ীদের শরীরের তাপমাত্রা প্রায় স্থির থাকে। কিন্তু স্লথের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের সঙ্গে ওঠানামা করতে থাকে। ঠান্ডা হলে তারা আরও ধীর হয়ে যায়, গরমে কিছুটা সক্রিয় হয়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের শরীর সবসময় বেশি শক্তি উৎপাদন করে না। বেশি শক্তি উৎপাদন না করলে জেগে থাকার ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে দিনের বড় একটি অংশ তারা ঘুমিয়ে কাটায়, বিশেষ করে তাপমাত্রা কম থাকলে।

স্লথের ধীর জীবনযাপন তাদের শত্রুদের কাছ থেকে বাঁচার একটি বড় উপায়। জঙ্গলে আছে ঈগল, জাগুয়ার, বড় সাপ যারা কি না সুযোগ পেলেই আক্রমণ করে বস্তে পারে। দ্রুত নড়াচড়া করলে সহজেই নজরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

স্লথ যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চুপ ঝুলে থাকে, তখন তারা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। তাদের শরীরে জন্মানো শৈবাল ও ছত্রাক লোমের রঙকে এমনভাবে বদলে দেয় যে, তারা গাছের অংশের মতোই দেখায়। কম জেগে থাকা মানে কম নড়াচড়া, আর কম নড়াচড়া মানেই শিকারির চোখ এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়।

স্লথের পেশি শক্তিশালী হলেও দ্রুত কাজ করার জন্য তৈরি নয়। বরং দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে ঝুলে থাকার জন্য তাদের শরীর বিশেষভাবে গঠিত। শক্তিশালী নখর থেকে বিশেষ ধরনের কাঁধের জয়েন্ট সবই দীর্ঘস্থায়ী বিশ্রামকে সহনীয় করে তোলে। এই শরীর নিয়ে বেশি সময় সক্রিয় থাকা বাস্তবসম্মত নয়। তাই অল্প সময় জেগে থেকে প্রয়োজনীয় কাজ অর্থাৎ খাবার খাওয়া, জায়গা বদল, বংশবিস্তার ইত্যাদি শেষ করে আবার বিশ্রামে চলে যাওয়াই তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।


গবেষণায় দেখা গেছে, স্লথের মস্তিষ্কে সক্রিয়তার মাত্রা তুলনামূলক কম। এর মানে এই না যে তারা একেবারে বুদ্ধিহীন, বরং তাদের জীবনধারাই এমন যে অতিরিক্ত মানসিক সতর্কতার প্রয়োজন পড়ে না।

তাদের খাবার লুকিয়ে খুঁজতে হয় না, এলাকা নিয়ে তেমন লড়াই নেই, নেই দলগত শিকার। ফলে দীর্ঘ সময় সতর্ক থাকার প্রয়োজনও হয় না। ঘুম তাদের মস্তিষ্ককে কম কাজ করতে দেয়, যা শক্তি সাশ্রয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এরা দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার বেশি জেগে থাকে না। বাকি সময় তারা ঘুমায় বা আধা ঘুমের অবস্থায় থাকে। অনেক সময় তাদের চোখ খোলা থাকলেও শরীর থাকে বিশ্রামে। অনেক সময় তারা হালকা ঘুমে থাকে, যাতে বিপদের আভাস পেলে ধীরে হলেও প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।


অনেক স্লথই আংশিকভাবে নিশাচর প্রকৃতির। দিনের আলোয় তারা প্রায় নিশ্চুপ থাকে, আর সন্ধ্যা বা ভোরের দিকে কিছুটা নড়াচড়া করে। এই সময় গাছের পাতা খাওয়া বা জায়গা বদলের মতো কাজগুলো সেরে নেয়। রাতের কম আলোতে শিকারির ঝুঁকি কম, তাপমাত্রাও তুলনামূলক আরামদায়ক। তাই এই সময়টুকু তারা বেছে নেয় জেগে থাকার জন্য।

মানুষের চোখে স্লথ অলস প্রাণী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের জীবনযাপন অত্যন্ত হিসেবি। তারা জানে কখন শক্তি খরচ করতে হবে, আর কখন নয়। প্রকৃতির কঠিন বাস্তবতায় এটি এক ধরনের বুদ্ধিমত্তাই বলা যায়। যে পরিবেশে খাবার কম শক্তিশালী, সেখানে দ্রুতগতি মানে দ্রুত মৃত্যু। স্লথ সেই ভুলটি করেনা। তারা ধীর গতিকে বেছে নিয়েছে, আর সেই পথেই টিকে আছে হাজার হাজার বছর ধরে।

মানুষের হস্তক্ষেপে বন উজাড়ের ফলে স্লথের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ব্যাহত হয়। গাছ কমে গেলে খাবার পেতে বেশি নড়াচড়া করতে হয়। এতে তাদের শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়, ঘুমের সময়ও কমে আসে।

এই পরিবর্তন স্লথের জন্য ভিষণ বিপজ্জনক। কারণ 

হঠাৎই বেশি সক্রিয়তার জন্য তাদের শরীর প্রস্তুত নয়। 

স্লথ দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকে, এটি কোনো কাকতালীয় আচরণ নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক নিখুঁত ফল। কম শক্তির খাবার, ধীর বিপাক, শিকারির ভয়, শরীরের বিশেষ গঠন সব মিলিয়ে ঘুমই তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। যেখানে অনেক প্রাণী দ্রুত দৌড়ে টিকে থাকে, সেখানে স্লথ প্রমাণ করেছে, ধীর গতিও বেঁচে থাকার শক্তিশালী কৌশল হতে পারে।

 

সম্পর্কিত নিউজ