শীতে গাছ বাঁচানোর সেরা সমাধান কি কোকোপিট?জানুন বিস্তারিত

শীতে গাছ বাঁচানোর সেরা সমাধান কি কোকোপিট?জানুন বিস্তারিত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শহর হোক বা গ্রাম,শীতকালে সবখানেই ফুল বাগানে নতুন প্রাণের ছোঁয়া লাগে। টবে, ছাদে, বারান্দায় কিংবা উঠোনে গাঁদা, পেটুনিয়া, ডায়ানথাস, ফ্লক্স, ক্যালেন্ডুলা, ফক্সটেল বা ভার্বেনার মতো শীতকালীন ফুলের চারা বসাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন শখের ও পেশাদার বাগানপ্রেমীরা। কিন্তু চোখে দেখা রঙিন ফুলের পেছনে যে নীরব একটি উপাদান গাছের শিকড়কে সুস্থ রাখে, পানি ধরে রাখে এবং ঠান্ডার চাপ সামলে গাছকে বাঁচিয়ে রাখে তা কিন্তু অনেক সময়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। সেই উপাদানটির নাম হলো কোকোপিট।

একসময় কোকোপিট প্রায় অপরিচিত একটি বস্তু ছিল। কিন্তু এখন এটি শহুরে বাগান, নার্সারি ও ছাদবাগানের অপরিহার্য অংশ। বিশেষ করে শীতকালীন ফুল চাষে কোকোপিটের ভূমিকা শুধু উপকারী নয়, অনেক ক্ষেত্রে নির্ণায়ক বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞ বাগানীরা।

কোকোপিট কী এবং এটি আসে কোথা থেকে?

কোকোপিট মূলত নারিকেলের খোসার ভেতরের আঁশ ও গুঁড়া অংশ থেকে তৈরি একটি প্রাকৃতিক উপাদান,যা নারিকেলের শক্ত খোসা ভেঙে যে আঁশ পাওয়া যায়, সেটি প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হয়। এটি হালকা এবং  ঝুরঝুরে। একে অনেক সময় কোকোডাস্ট বা কয়ার পিটও বলা হয়ে থাকে।

এটি কোনো রাসায়নিক সার নয়, আবার সরাসরি মাটিও নয়। বরং মাটির সঙ্গে মিশে কাজ করা একটি সহায়ক উপাদান, যা শিকড়ের চারপাশের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে।

শীতকালে মাটির সমস্যা এবং কোকোপিটের ভূমিকা!

শীতকালীন ফুলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে মাটির ভেতরে। ঠান্ডায় মাটি শক্ত হয়ে যায়, পানি জমে থাকে, আবার কখনো অতিরিক্ত শুকিয়েও যায়। বিশেষ করে টবে লাগানো গাছের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে যায়। কোকোপিট এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।কোকোপিট -

⇨ মাটিকে ঝুরঝুরে রাখে
⇨ শিকড়ের চারপাশে বাতাস চলাচলের সুযোগ দেয়।
⇨ অতিরিক্ত পানি জমে থাকতে দেয় না, আবার প্রয়োজনীয় আর্দ্রতাও ধরে রাখে।

এই ভারসাম্যই শীতকালীন ফুলের জন্য সবচেয়ে জরুরি।
গাছের ফুল আসা পুরোপুরি নির্ভর করে শিকড়ের স্বাস্থ্যের ওপর। শিকড় যদি অক্সিজেন পায়, সহজে ছড়াতে পারে এবং পচে না যায় তাবে গাছও পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। কোকোপিটের গঠন এমন যে, এর ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ফাঁক থাকে। এই ফাঁক দিয়ে বাতাস চলাচল করে। ফলে শীতকালে যখন মাটি জমাট বাঁধার ঝুঁকি থাকে, তখন কোকোপিট মিশ্রিত মাটিতে শিকড় শ্বাস নিতে পারে। এর ফলে গাছ দ্রুত নতুন শিকড় গজায়। চারার বৃদ্ধিও হয়  সমানভাবে এবং ফুলের কুঁড়ি ঝরে পড়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসে।

পানি ব্যবস্থাপনায় কোকোপিট কেন এত কার্যকর?

শীতকালে অনেকেই মনে করে থাকেন, গাছে পানি কম লাগবে। এই ধারণা আংশিক সত্য হলেও পুরোপুরি নয়। শীতের হালকা রোদ ও বাতাসে টবের মাটি কখনো হঠাৎ শুকিয়ে যায়, আবার বেশি পানি দিলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কোকোপিট এই দুই সমস্যার মাঝখানে ভারসাম্য রাখে। এটি নিজের ওজনের কয়েক গুণ পানি ধরে রাখতে পারে। আবার অতিরিক্ত পানি হলে ধীরে ধীরে তা বের হতে সহায়তা করে। ফলে গাছের গোড়ায় হঠাৎ পানি জমে থাকে না। এতে করে শিকড় পচে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়।

নিয়মিত পানি না দিলেও গাছ হঠাৎ শুকিয়ে যায় না
শীতকালীন ফুলের জন্য এই স্থির আর্দ্রতা খুবই জরুরি।

শীতের ঠান্ডা থেকে শিকড়কে সুরক্ষা দেয় কীভাবে?

শীতের সময় রাতেরবেলা মাটির তাপমাত্রা হঠাৎ খুব কমে গেলে শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে ছাদবাগান বা টবে রাখা গাছের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। সেক্ষেত্রে কোকোপিট এক ধরনের প্রাকৃতিক ইনসুলেটরের মতো কাজ করে। এটি মাটির ভেতরে তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তন ধীরে করে ফেলে। এর ফলে শিকড় সরাসরি ঠান্ডার ধাক্কা খায় না। গাছের বৃদ্ধিও থেমে যায় না। এতে কুঁড়ি ধরার সময় গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে না।


শীতকালীন কোন কোন ফুলে কোকোপিট বেশি উপকারী?

প্রায় সব শীতকালীন ফুলেই কোকোপিট উপকারী হলেও কিছু ফুলে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট দেখা যায়। যেমন - গাঁদা, পেটুনিয়া, ডায়ানথাস, ফ্লক্স, ক্যালেন্ডুলা, ভার্বেনা, ফক্সটেল, লোবেলিয়া ইত্যাদি  ফুলগুলোর শিকড় তুলনামূলক নরম এবং পানি জমে থাকলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এসব ফুল গাছের জন্য কোকোপিট নিরাপদ।

তবে আমাদের মধ্যে  একটি  একটি ভুল ধারণা হলো রয়েছে। অনেকেই মনে করেন শুধু কোকোপিটেই ফুল ভালো হবে,যা একেবারেই ভুল। বাস্তবে কোকোপিট কখনোই একা ব্যবহারের জন্য নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে এটি মাটির সহায়ক, মাটির বিকল্প নয়। 

শীতকালীন ফুলের জন্য সাধারণত দোআঁশ মাটি, জৈব সার, অল্প পরিমাণ বালি এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ কোকোপিট এই মিশ্রণেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। কোকোপিট বেশি হলে মাটি অতিরিক্ত হালকা হয়ে যেতে পারে, ফলে গাছ ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আবার খুব কম হলে এর সুফলও পুরোটা পাওয়া যায় না।

শহুরে ছাদবাগানে কোকোপিটের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে! শহরের ছাদ বা বারান্দায় ফুল চাষের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো মাটি ভারী করা যায় না। অতিরিক্ত ভার ছাদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

কোকোপিট এই সমস্যার সহজ সমাধান। এটি হালকা, কিন্তু কার্যকর। ফলে টবের ওজন কম থাকে এবং  মাটির গুণগত মান ঠিক থাকে। শীতকালেও গাছ সহজে মানিয়ে নেয়। এ কারণেই ছাদবাগানে শীতকালীন ফুল চাষে কোকোপিট এখন প্রায় অপরিহার্য।

পরিবেশবান্ধব দিক থেকেও কোকোপিট গুরুত্বপূর্ণ। কোকোপিট পুরোপুরি প্রাকৃতিক এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য। এটি ব্যবহারে মাটির ক্ষতি হয় না, পরিবেশ দূষণ হয় না।শীতকালীন ফুল চাষে যখন রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার কমানো যায়, তখন মাটির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ভালো থাকে। ফুলেরও স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় থাকে। পরিবেশের ওপর চাপ কম পড়ে। 

কোকোপিট কোনো জাদুকরী উপাদান নয়। এটি গাছের যত্নের বিকল্পও নয়। নিয়মিত আলো, সঠিক পানি, প্রয়োজনীয় পুষ্টি সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় করলেই কোকোপিট তার পুরো উপকারিতা দেখায়।

যাঁরা শীতে ফুলে ফুলে ভরে উঠতে চান, তাঁদের জন্য কোকোপিট হতে পারে নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী। কিন্তু চালকের আসনে থাকতে হবে সচেতন পরিচর্যাই।

শীতকালীন ফুলের সৌন্দর্য শুধু চোখে নয়, মাটির ভেতরেও লুকিয়ে থাকে। সেই মাটির ভেতরের পরিবেশ যদি ঠিক না থাকে, তাহলে যত যত্নই নেওয়া হোক না কেন , ফুল তার পূর্ণতা পাবে না। কোকোপিট সেই নীরব উপাদান, যা শিকড়কে সুরক্ষা দেয়, মাটিকে জীবন্ত রাখে এবং শীতের প্রতিকূলতা সামলে ফুলকে বিকশিত হতে সাহায্য করে।

 

সম্পর্কিত নিউজ