কার্বন বন্দি প্রযুক্তি নিয়ে নতুন আবিষ্কার! বিজ্ঞানীরা যা বলছেন..

কার্বন বন্দি প্রযুক্তি নিয়ে  নতুন আবিষ্কার! বিজ্ঞানীরা যা বলছেন..
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নাম। শিল্পকারখানার চিমনি, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যানবাহন সব মিলিয়ে এই অদৃশ্য গ্যাসই আজ বৈশ্বিক উষ্ণতার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। বহুবছর ধরেই কার্বন নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু বাস্তবে আধুনিক সভ্যতা এখনো পুরোপুরি কার্বনমুক্ত হতে পারেনি। ঠিক এই জায়গাতেই নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি। যে প্রযুক্তি কার্বন তৈরি হওয়ার পর সেটিকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ধরে ফেলতে চায়। কার্বন ক্যাপচার শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, এটি পরিবেশ রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনও বটে। এটি শেখায়, সমস্যা তৈরি হলে শুধু উৎস বন্ধ করাই একমাত্র পথ নয়, কখনো কখনো সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করাও বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।

কার্বন ক্যাপচার কী?

কার্বন ক্যাপচার বলতে বোঝায় এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে শিল্প বা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে বাতাসে মিশে যাওয়ার আগেই আলাদা করে নেওয়া হয়। পরে সেই কার্বনকে মাটির নিচে সংরক্ষণ করা হয় অথবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, ধোঁয়ার সঙ্গে বেরিয়ে যাওয়া কার্বনকে আটকে ফেলা। এই ধারণার ওপরই পুরো প্রযুক্তির ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এতে কার্বন পুরোপুরি তৈরি হওয়া বন্ধ হয় না ঠিকই  কিন্তু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।

কেন এই প্রযুক্তির প্রয়োজন দেখা দিল?

বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও বাস্তবতা হলো অনেক দেশ এখনো কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। রাতারাতি এসব বন্ধ করা অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কার্বন ক্যাপচার এই সংকটের মাঝামাঝি একটি পথ দেখায়। যতদিন পুরোপুরি পরিষ্কার জ্বালানিতে যাওয়া সম্ভব না, ততদিন অন্তত কার্বনকে নিয়ন্ত্রণে আনা হোক। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মধ্যে এই প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ দিন দিন  বাড়েই চলছে।

কার্বন ক্যাপচারের তিনটি মূল ধাপ রয়েছে! 

☞ প্রথম ধাপ হলো কার্বন সংগ্রহ করা। শিল্পকারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড আলাদা করা হয়।

☞ দ্বিতীয় ধাপ কার্বন পরিবহন। সংগ্রহ করা কার্বন পাইপলাইন বা অন্য মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

~ তৃতীয় ধাপ কার্বন সংরক্ষণ বা ব্যবহার। কার্বনকে গভীর ভূগর্ভে সংরক্ষণ করা হয় অথবা শিল্পে অন্যভাবে কাজে লাগানো হয়।

এই তিন ধাপ একসঙ্গে কাজ করলেই কার্বন ক্যাপচার কার্যকর হয়।

শিল্পকারখানার ধোঁয়া শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইড নয়,বরং নানা গ্যাসের মিশ্রণ। এই মিশ্রণ থেকে নির্দিষ্ট একটি গ্যাস আলাদা করা প্রযুক্তিগতভাবে বেশ জটিল। এ জন্য বিশেষ রাসায়নিক বা ঝিল্লিভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডকে আটকে রাখে। তবে এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি প্রয়োজন হয়, যা পুরো ব্যবস্থার খরচও বাড়িয়ে দেয়। এই জায়গাটিই কার্বন ক্যাপচারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সংগ্রহ করা কার্বন সাধারণত গভীর ভূগর্ভে সংরক্ষণ করা হয়, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে গ্যাস আটকে থাকার ক্ষমতা রয়েছে। এই স্তরগুলো হাজার হাজার বছর ধরে তেল বা গ্যাস ধরে রেখেছে, তাই সেগুলো কার্বন সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হয়।তবে প্রশ্ন থেকেই যায়- দীর্ঘমেয়াদে এটি কতটা নিরাপদ? কার্বন লিক হওয়ার ঝুঁকি কতটা? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই  এখনো চলছে ব্যাপক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ।

কার্বন ক্যাপচারের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো সংগ্রহ করা কার্বনকে শুধু মাটির নিচে পুঁতে না রেখে ব্যবহারও করা যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কার্বন ব্যবহার। সংগ্রহ করা কার্বন দিয়ে  নির্মাণ সামগ্রী তৈরি, কৃত্রিম জ্বালানি উৎপাদন, রাসায়নিক শিল্পে কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এই ধারণা কার্বনকে বর্জ্য নয়, বরং সম্পদ হিসেবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।

সমালোচকেরা বলেন, কার্বন ক্যাপচার মূল সমস্যার সমাধান নয়, এটি কেবল ক্ষতি কমানোর চেষ্টা। এই সমালোচনায় রয়েছে আংশিম সত্যতা। কারণ এই প্রযুক্তি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করে না। তবে সমর্থকেরা যুক্তি দেন যে, জলবায়ু সংকট এতটাই তীব্র যে শুধু ভবিষ্যতের সমাধানের অপেক্ষায় বসে থাকা  এখন আর সম্ভব নয়। বর্তমান নিঃসরণ কমাতে কার্বন ক্যাপচার একটি কার্যকর হাতিয়ার হতেই পারে।

কার্বন ক্যাপচার শুধু একটি যন্ত্র বা প্রক্রিয়া নয়, এটি এক ধরনের চিন্তার পরিবর্তন। এটি শেখায়, পরিবেশ সমস্যার সমাধান একমুখী নয়, বিজ্ঞান ও বাস্তবতার সমন্বয় জরুরি। ক্ষতি কমানোও বড় সাফল্য হতে পারে। এই শিক্ষণীয় দিকটিই একে সাধারণ প্রযুক্তির চেয়ে আলাদা করে তোলে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো শিল্পায়নের পথে রয়েছে। তাদের জন্য একদিকে পরিবেশ রক্ষা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন। কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি এই দেশগুলোর জন্য একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। তবে এর উচ্চ খরচ ও প্রযুক্তিগত জটিলতা একটি বড় বাধা। 

কার্বন ক্যাপচারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর অতিরিক্ত খরচ। কার্বন ধরতে, পরিবহন করতে ও সংরক্ষণ করতে বিপুল অর্থ ও শক্তির প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত শক্তি আবার অন্য উৎস থেকেও আসে, যা পরোক্ষভাবে নতুন কার্বন নিঃসরণ ঘটাতে পারে। এই দ্বন্দ্বই প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত ও দক্ষ করার তাগিদ দিচ্ছে।

গবেষকেরা এখন এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা কম শক্তিতে বেশি কার্বন ধরতে পারবে। পাশাপাশি কার্বন ব্যবহারের নতুন নতুন পথ খোঁজা হচ্ছে, যাতে এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়। যদি কার্বন ক্যাপচার সস্তা ও কার্যকর হয়, তাহলে এটি জলবায়ু লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

কার্বন ক্যাপচার যদিও জলবায়ু সংকটের সব সমস্যার উত্তর দেয় না, তবে এটি আমাদের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তুলে দেয়। এটি বর্তমান ক্ষতিকে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ।

পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে কখনো কখনো সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে বাস্তবতা মেনে নেওয়া থেকে। কার্বন ক্যাপচার সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

সম্পর্কিত নিউজ