দায়িত্ব নয়, আনন্দের উৎস-"দ্য জয় অফ ওয়ার্ক" কী শেখায়?

দায়িত্ব নয়, আনন্দের উৎস-"দ্য জয় অফ ওয়ার্ক" কী শেখায়?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

কাজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। কিন্তু কাজ মানেই কি কেবল দায়িত্ব, চাপ আর সময়ের সঙ্গে লড়াই? নাকি কাজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আত্মতৃপ্তি, অর্থবোধ আর জীবনের গভীর আনন্দ? আধুনিক কর্মজীবনের এই মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই লেখা হয়েছে "দ্য জয় অফ ওয়ার্ক" (The Joy of Work) বইটি। এটি একটি চিন্তনধর্মী বই। বইটি কাজকে দেখার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

"দ্য জয় অফ ওয়ার্ক" বইটি  ১৯৯৮ সালে স্কট অ্যাডামসের লেখা। বইটি দুই পর্বের। প্রথম পর্বে অফিস কর্মীরা তাদের কিউবিকেল ডেস্কে কীভাবে সুখ খুঁজে পেতে পারেন তার সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। আর দ্বিতীয় পর্বে লেখকের ডিলবার্ট কমিক স্ট্রিপ লেখার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে হাস্যরস তৈরির একটি সূত্র দেওয়া হয়েছে। 

আজকের কর্মজীবন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুতগতির। প্রযুক্তি কাজ সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে কাজের সময় বেড়েছে, বেড়েছে মানসিক চাপও। ফলে কাজ ও ব্যক্তিজীবনের সীমারেখা ঝাপসা হয়েছে।এই বাস্তবতায় কাজ অনেকের কাছে আর আত্মপরিচয়ের জায়গা নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে ক্লান্তির অপর নাম। “The Joy of Work” এই সংকটকে অস্বীকার করে না। বরং বইটি দেখাতে চায়, সমস্যা কাজের মধ্যে নয়, সমস্যা আমাদের কাজকে দেখার পদ্ধতিতে।

বইটির কেন্দ্রীয় ধারণা হলো কাজের আনন্দ কেবল সফলতা বা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কাজের প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি চেষ্টা এবং প্রতিটি শেখার মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দ লুকিয়ে থাকতে পারে। এখানে কাজকে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে-

◑ কাজ কী দিচ্ছে! যেমন : অর্থ, নিরাপত্তা, স্বীকৃতি।
◑ কাজ আমাকে কী বানাচ্ছে!  যেমন : দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, পরিচয়।
◑ কাজের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেমন!  যেমন: চাপের না আনন্দের।

এই তিন স্তরের ভারসাম্যই ঠিক করে দেয় কাজ আনন্দের হবে, না মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

“The Joy of Work” বইটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, যাঁরা তাঁদের কাজের মধ্যে ব্যক্তিগত অর্থ খুঁজে পান, তাঁদের মধ্যে কাজসংক্রান্ত সন্তুষ্টি অনেক বেশি থাকে।  অর্থবোধ মানে কেবল বড় কোনো লক্ষ্য নয়। মাঝে মাঝে অন্যের উপকার করা, নিজের দক্ষতা উন্নত করা, প্রতিদিন একটু ভালো হওয়া ইত্যাদি। 

একই কাজ, একই পরিবেশে থেকেও কেউ কাজকে উপভোগ করেন, কেউ বা আবার করেন না। পার্থক্যটা তৈরি করে মনোভাব। “The Joy of Work” দেখায় কাজকে বাধ্যবাধকতা ভাবলে ক্লান্তি বাড়ে, শেখার সুযোগ ভাবলে আগ্রহ বাড়ে। নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই কাজের অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।

বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে কাজ ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক। এখানে কাজকে শুধু উৎপাদনশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়নি; বরং কাজ মানুষের মানসিক অবস্থাকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।বইটি তুলে ধরে অর্থহীন কাজ মানসিক অবসাদ বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ সৃজনশীলতা কমিয়ে দেয়। স্বীকৃতির অভাব আত্মসম্মান ক্ষয় করে। একই সঙ্গে বইটি দেখায়, সচেতন কাজের অভ্যাস কীভাবে মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারে।

“The Joy of Work” কাজের আনন্দকে কোনো রোমান্টিক ধারণা হিসেবে তুলে ধরে না। এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কাজের আনন্দ মানে কাজ সব সময় সহজ বা আরামদায়ক হবে, তা নয়। বরং চ্যালেঞ্জ থাকবে, ভুল হবে, ক্লান্তি আসবে। কিন্তু এই কঠিন পথের মধ্য দিয়েই যে পরিপূর্ণতার অনুভূতি আসে, সেটিই প্রকৃত আনন্দ। বইটি এই বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে শেখায়।

আজকের যুগে “বার্নআউট”, “কাজের চাপ” বা “কর্মজীবনের অসন্তুষ্টি”,এই শব্দগুলো ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে “The Joy of Work”এক ধরনের চিন্তার বিরতি। এটি পাঠককে থামতে শেখায়, নিজের কাজের দিকে নতুন চোখে তাকাতে শেখায় এবং প্রশ্ন করতে শেখায়—আমি কীভাবে কাজ করছি, আর কেন করছি।

এই বই পড়ার পর পাঠক, নিজের কাজকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করতে পারবে, কাজের মধ্যে ব্যক্তিগত অর্থ খুঁজে পেতে শুরু করেন, চাপের ভেতরেও নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি পাবে। এটি কোনো তাৎক্ষণিক সমাধানের বই নয়,  এটি ধীরে ধীরে চিন্তার কাঠামো বদলে দেয়।


এই বই কাজকে পালানোর বিষয় নয়, বরং বোঝার বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। কাজের ভেতরে আনন্দ খুঁজে পাওয়ার অর্থ হলো নিজের সঙ্গে, নিজের সময়ের সঙ্গে এবং নিজের শ্রমের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তোলা।

সম্পর্কিত নিউজ