এই কারণেই অপমান ভুলতে পারেন না! গবেষণায় পাওয়া চমক...

এই কারণেই অপমান ভুলতে পারেন না! গবেষণায় পাওয়া চমক...
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মানুষ তার সারাজীবনে ভালো, মন্দ, তিক্ত অনেক রকমের কথা শোনে থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনক বাস্তবতা হলো, একটি প্রশংসা যত সহজে মন ভালো করে দেয় , তত দ্রুতই তা স্মৃতি থেকে ঝরেও পড়ে যায়। অন্যদিকে একটি অপমান, একটি অবজ্ঞাসূচক বাক্য বা ছোট্ট মানসিক আঘাত মনের ভেতরে গেঁথে থাকে বছরের পর বছর, কখনো কখনো প্রায় দুই দশক পর্যন্ত। সাম্প্রতিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণাগুলো এই বাস্তবতার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানব মস্তিষ্ক সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

এই বৈপরীত্য কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি গভীরভাবে জড়িত মানুষের টিকে থাকার বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া, স্মৃতির গঠন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে।
গবেষণা বলছে, স্মৃতি নিরপেক্ষ না। সাধারণভাবে আমরা মনে করি, স্মৃতি একটি রেকর্ডিং যন্ত্রের মতো যা-ই ঘটে, তা-ই সংরক্ষণ করে রাখে। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, মানুষের স্মৃতি মোটেও নিরপেক্ষ নয়। বরং এটি নেগেটিভ তথ্যের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট।

মস্তিষ্ক ভালো ও খারাপ অভিজ্ঞতাকে সমানভাবে প্রক্রিয়াজাত করে না। অপমান, অবজ্ঞা, সামাজিক প্রত্যাখ্যান কিংবা মানসিক আঘাত মস্তিষ্কে বেশি গভীর ছাপ ফেলে। কারণ  মস্তিষ্ক এসবকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে নেট ।

অপমান কেন এত দীর্ঘস্থায়ী হয়?
অপমান বা মানসিক আঘাতের সময় মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। এই সময় শরীরে চাপজনিত হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্ককে সতর্ক অবস্থায় নিয়ে যায়। এই সতর্কতা আসলে একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মানুষের পূর্বপুরুষদের জন্য সামাজিক অপমান বা প্রত্যাখ্যান মানে ছিল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি, যা টিকে থাকার জন্য মারাত্মক বিপদজনক। ফলে মস্তিষ্ক এই ধরনের অভিজ্ঞতাকে ভুলে গেলে চলবে না তালিকায় রাখে।

প্রশংসা কেন টিকে থাকে না?
প্রশংসা সাধারণত আনন্দদায়ক হলেও মস্তিষ্ক একে জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখে না। ভালো কথা শোনার সময় মস্তিষ্ক স্বস্তি পায়, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ নয়, এমনটাই মস্তিষ্ক ধরে নেয়। ফলে প্রশংসা থেকে উৎপন্ন ইতিবাচক আবেগ তুলনামূলক কম সময় সক্রিয় থাকে। কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যেই সেই স্মৃতি দুর্বল হয়ে যায়, যদি না সেটি বারবার পুনরাবৃত্ত হয় বা গভীর আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়।

মস্তিষ্কে স্মৃতি গঠনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাসায়নিক বার্তাবাহক কাজ করে। চাপ ও ভয়ের সঙ্গে যুক্ত রাসায়নিক উপাদানগুলো স্মৃতিকে শক্তভাবে স্থায়ী করে তোলে। অন্যদিকে স্বস্তি ও আনন্দের সঙ্গে যুক্ত উপাদানগুলো দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

এই কারণেই পরীক্ষায় দেখা যায়, একটি তিক্ত মন্তব্য বা অপমানজনক ঘটনা বহু বছর পরেও মানুষ হুবহু মনে করতে পারে, অথচ গত মাসে পাওয়া আন্তরিক প্রশংসা স্পষ্টভাবে মনে করতে পারে না। এই স্মৃতিগত পক্ষপাত মানুষের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। একজন মানুষ দশটি ভালো আচরণের চেয়ে একটি খারাপ আচরণকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে সম্পর্ক ভেঙে যায় সহজে, ভুল বোঝাবুঝি দীর্ঘস্থায়ী হয়, আত্মসম্মান আঘাতপ্রাপ্ত হয়, এমনকি মানসিক চাপ জমতে থাকে। অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই পুরোনো অপমানের স্মৃতি বহন করে চলে, যা বর্তমান সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কর্মক্ষেত্রে একটি তুচ্ছ মন্তব্য, অবমূল্যায়ন বা প্রকাশ্য সমালোচনা কর্মীর আত্মবিশ্বাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। মজার ব্যাপার হলো, একই কর্মী হয়তো বহুবার প্রশংসা পেয়েছেন, কিন্তু একটি অপমানই তার পেশাগত স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকে। এ কারণেই আধুনিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক যোগাযোগ ও সম্মানজনক ভাষার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে।

ডিজিটাল যুগে অপমান আরও স্থায়ী হয়ে উঠেছে। একটি নেতিবাচক মন্তব্য বা ট্রোলিং শুধু মুহূর্তের অপমান নয়, তা স্ক্রিনশট হয়ে, স্মৃতি হয়ে বারবার ফিরে আসে। অন্যদিকে প্রশংসা স্ক্রল করে হারিয়ে যায়। এই বৈপরীত্য মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তবে কি মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশংসা মনে রাখতে পারে না?

এটা সম্পূর্ণ অসহায় পরিস্থিতি নয়। গবেষণা বলছে, সচেতন অনুশীলনের মাধ্যমে ইতিবাচক স্মৃতিকে দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব।

যেমন- 

প্রশংসা শোনার পর তা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবা।
লিখে রাখা বা কারও সঙ্গে শেয়ার করা।
নিজের অর্জনকে অবহেলা না করা।
নেতিবাচক স্মৃতিকে পুনর্মূল্যায়ন করা।

এই অভ্যাসগুলো মস্তিষ্ককে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে ভালো অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সংরক্ষিত হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বার্তা
যদি মানুষ অপমান সহজে ভুলে যেত, তাহলে হয়তো সে একই ভুল বারবার করত। আবার যদি প্রশংসা দীর্ঘদিন তীব্রভাবে থেকে যেত, তাহলে আত্মতুষ্টি বাড়তে পারত। মস্তিষ্কের এই অসম আচরণ আসলে একধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। তবে আধুনিক সমাজে যেখানে সামাজিক চাপ, প্রতিযোগিতা ও তুলনা বেড়েছে, সেখানে এই প্রাকৃতিক প্রবণতা অনেক সময় মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে।

মানুষের মস্তিষ্ক শুধু স্মৃতি ধরে রাখে না, সে বেছে বেছে স্মৃতি ধরে রাখে। অপমানকে সে মনে রাখে সতর্কবার্তা হিসেবে, আর প্রশংসাকে দেখে সাময়িক স্বস্তি হিসেবে। এই কারণেই একটি খারাপ কথা অনেক বছর মনে গেঁথে থাকে, আর শত ভালো কথাও মিলিয়ে যায় সময়ের স্রোতে। এই বাস্তবতা বোঝা মানে নিজেকে বোঝা। আমাদের উচিত অপমানের স্মৃতিকে চিহ্নিত করা, তার প্রভাব বুঝে নেওয়া এবং প্রশংসাকে সচেতনভাবে গুরুত্ব দেওয়া

সম্পর্কিত নিউজ