পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে শব্দ বনাম নীরবতা কোনটা কার্যকর? - গবেষণার ফলাফল

পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে শব্দ বনাম নীরবতা কোনটা কার্যকর? - গবেষণার ফলাফল
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

পড়ার টেবিলে বসেই দ্বিধা! চারপাশ একেবারে নীরব রাখবেন, নাকি হালকা গান বা শব্দ চালু করবেন! কারও কাছে নিস্তব্ধতা মানেই মনোযোগ, আবার কারও কাছে সামান্য শব্দ ছাড়া পড়া প্রায় অসম্ভব। এই দ্বন্দ্ব একেবারে নতুন নয়। যুগে যুগে শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকরা প্রশ্নটি করে আসছেন, পড়াশোনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পরিবেশ কোনটি শব্দপূর্ণ না নীরব?

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, এর উত্তর ধ্রুবক নয়। কারণ পড়াশোনা শুধু বই পড়া নয়, এটি একটি জটিল মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে মনোযোগ, স্মৃতি, আবেগ ও পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে। শব্দ বা নীরবতা কোনটি উপকারী হবে, তা নির্ভর করে মস্তিষ্কের কাজের ধরন, পড়ার বিষয়বস্তু এবং ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থার ওপর। আজকে আমরা জানবো শব্দ ও নীরবতার প্রভাব, কোন পরিস্থিতিতে কোন পরিবেশ সবচেয়ে কার্যকর, এবং কীভাবে নিজের জন্য সঠিক পড়ার পরিবেশ তৈরি করা যায়।

পড়াশোনার সময় মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে?
মানুষ যখন পড়াশোনা করে, তখন মস্তিষ্কের একাধিক অংশ একসঙ্গে সক্রিয় হয়। চোখ তথ্য সংগ্রহ করে, ভাষা-সম্পর্কিত অংশ সেই তথ্য বোঝে, স্মৃতির অংশ তা সংরক্ষণ করে, আর মনোযোগের অংশ অপ্রয়োজনীয় তথ্য ছেঁটে ফেলে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মনোযোগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মনোযোগ ঠিকমতো কাজ না করলে পড়া হলেও তা মনে থাকে না। আর মনোযোগ খুব সহজেই পরিবেশের প্রভাবে বিচলিত হয় বিশেষ করে শব্দের মাধ্যমে।

মনোযোগের প্রাকৃতিক আশ্রয়:
নীরবতা অনেকের কাছে পড়াশোনার জন্য আদর্শ পরিবেশ। কারণ নীরব পরিবেশে মস্তিষ্ককে বাইরের উদ্দীপনা ছাঁকতে অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হয় না। ফলে মনোযোগ সরাসরি পড়ার কাজে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। বিশেষ করে কঠিন বিষয় বোঝা, নতুন তথ্য শেখা, গণিত, বিজ্ঞান বা বিশ্লেষণধর্মী পড়াশোনা ইত্যাদি  ধরনের কাজে নীরবতা বেশি কার্যকর বলে মনে করা হয়। কারণ, এসব ক্ষেত্রে মস্তিষ্ককে গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়, যুক্তি তৈরি করতে হয়, এবং ভুল ধরতে হয়। সামান্য শব্দও তখন মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে। নীরব পরিবেশে পড়াশোনার আরেকটি সুবিধা হলো তথ্য স্মৃতিতে গভীরভাবে বসে। কারণ মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত না হয়ে একটি কাজেই সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে।

কিন্তু নীরবতা কি সবার জন্যই কাজ করে?
সব মানুষের মস্তিষ্ক একভাবে কাজ করে না।অনেকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নীরবতা উল্টো সমস্যা তৈরি করে। নিস্তব্ধ পরিবেশে তারা নিজের চিন্তার শব্দেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। ছোটখাটো চিন্তা, দুশ্চিন্তা বা একঘেয়েমি তখন বেশি করে মাথায় আসে। বিশেষ করে যাদের মনোযোগ সহজে ছুটে যায়, তাদের জন্য সম্পূর্ণ নীরবতা কখনো কখনো অস্বস্তিকর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক বাইরের কোনো হালকা উদ্দীপনা না পেয়ে নিজের ভেতরের চিন্তায় হারিয়ে যায়।

মস্তিষ্কের জন্য নিয়ন্ত্রিত উদ্দীপনা:
হালকা শব্দ, যেমন-মৃদু সংগীত, পরিবেশগত শব্দ বা একঘেয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়াজ ইত্যাদি অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উপকারী হতে পারে। এই ধরনের শব্দ মস্তিষ্ককে একটি সীমিত উদ্দীপনা দেয়, যা মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে লেখা-পড়া রিভিশন, সৃজনশীল কাজ, দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা- এই ধরনের কাজে হালকা শব্দ অনেকের মনোযোগ বাড়াতে পারে। কারণ এটি বাইরের বড় শব্দগুলোকে ঢেকে দেয় এবং মস্তিষ্ককে একটি স্থিতিশীল ছন্দে রাখে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শব্দের ধরন। সব শব্দই উপকারী নয়।

কোন ধরনের শব্দ ক্ষতিকর?
পড়াশোনার সময় সবচেয়ে ক্ষতিকর শব্দ হলো, কথোপকথন, টিভি বা ভিডিওর সংলাপ, মোবাইল নোটিফিকেশনের শব্দ ইত্যাদি। কারণ মানুষের মস্তিষ্ক ভাষাকে উপেক্ষা করতে পারে না। পাশে কেউ কথা বললে বা টিভিতে সংলাপ চললে মস্তিষ্ক অজান্তেই সেই ভাষা বোঝার চেষ্টা করে। ফলে পড়ার কাজে মনোযোগ কমে যায়। অন্যদিকে, যেসব শব্দে স্পষ্ট ভাষা নেই, যেমন- হালকা যন্ত্রসংগীত বা একঘেয়ে পরিবেশগত শব্দ। এগুলো তুলনামূলকভাবে কম বিভ্রান্তিকর।

পড়ার বিষয় অনুযায়ী পরিবেশ বদলানো জরুরি!
একই পরিবেশে সব ধরনের পড়াশোনা সমান কার্যকর হয় না। বিষয়ভেদে পরিবেশ নির্বাচন করলে ফল ভালো পাওয়া যায়।যেমন, 

⇨ গভীর বোঝাপড়া ও বিশ্লেষণে, নীরবতা বেশি উপযোগী

⇨ মুখস্থ বা রিভিশনের ক্ষেত্রে হালকা শব্দ সহায়ক হতে পারে

⇨সৃজনশীল লেখা বা ভাবনায়, হালকা সংগীত অনেকের কাজে আসে

⇨ পরীক্ষার আগে কঠিন অঙ্কের জন্য নিস্তব্ধ পরিবেশ বেশি কার্যকর।

এখানে কোনো কঠোর নিয়ম নেই। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত আসে।


কিছু মানুষ স্বভাবগতভাবে বেশি সংবেদনশীল। তারা সামান্য শব্দেও মনোযোগ হারান। আবার কেউ কেউ শব্দের মধ্যেই ভালো কাজ করতে পারেন। এটি অনেকটা ব্যক্তিত্ব ও স্নায়বিক গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত।যাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা তুলনামূলক কম, তাদের ক্ষেত্রে হালকা শব্দ কখনো কখনো মনোযোগ স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে। আর যাদের মনোযোগ গভীর ও স্থায়ী, তাদের জন্য নীরবতা বেশি ফলপ্রসূ হয়।

দীর্ঘমেয়াদে কোনটি ভালো?
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো-পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করা। কারণ বাস্তব জীবনে সব সময় আদর্শ পরিবেশ পাওয়া যায় না। কখনো নীরবতা, কখনো শব্দ উভয় পরিস্থিতিতেই পড়াশোনা করার অভ্যাস গড়ে তুললে মানসিক স্থিতিশীলতা বাড়ে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় নিজের সবচেয়ে কার্যকর পরিবেশটি বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

শব্দ বনাম নীরবতা, প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। কারণ পড়াশোনা শুধু বই আর চোখের সম্পর্ক নয়। এটি মস্তিষ্ক, পরিবেশ ও ব্যক্তিত্বের সম্মিলিত ফল। নীরবতা মনোযোগের গভীরতা বাড়ায়, আর হালকা শব্দ অনেকের ক্ষেত্রে মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। কোনটি আপনার জন্য কার্যকর, তা বোঝার একমাত্র উপায় হলো নিজের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পড়ার পরিবেশ যেন আপনাকে বিরক্ত না করে, বরং পড়ার সঙ্গে মানসিক সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে। শব্দ হোক বা নীরবতা, যে পরিবেশে মস্তিষ্ক সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে কাজ করে, সেটিই আপনার জন্য সেরা পড়াশোনার পরিবেশ।
 

সম্পর্কিত নিউজ