বিজ্ঞান বলছে, জিরাফের লম্বা গলার আসল রহস্য হাড় নয়, কাঠামো! জানেন কীভাবে?

বিজ্ঞান বলছে, জিরাফের লম্বা গলার আসল রহস্য হাড় নয়, কাঠামো! জানেন কীভাবে?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

প্রথম দেখাতেই যেন চোখ আটকে যায়। বিশাল দেহ, লম্বা পা, আর তার ওপর যেন অবিশ্বাস্যভাবে লম্বা এক গলা। সাধারণ মানুষের ধারণা, এত লম্বা গলার জন্য নিশ্চয়ই জিরাফের গলায় অসংখ্য হাড় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা জানলে অনেকেই বিস্মিত হয়ে যান। জিরাফের লম্বা গলায় অসংখ্য নয় বরং মানুষের গলার মতোই রয়েছে, মাত্র ৭টি কশেরুকা হাড়। এই তথ্য শুধু চমকপ্রদ নয়, এটি প্রাণিবিদ্যা, বিবর্তন এবং দেহগঠনের জটিলতার এক অনন্য উদাহরণ। প্রশ্ন একটাই, সংখ্যা যদি একই হয়, তবে জিরাফের গলা এত লম্বা হলো কীভাবে!

রহস্যময় আমাদের এই পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে পরিচিত–অপরিচিত, আকর্ষণীয়–অনাকর্ষণীয়- অগণিত বৈচিত্র্যময় প্রাণিবিন্যাস। আর সেই বৈচিত্র্যই পৃথিবীকে করে তুলেছে আরও বিস্ময়কর। জিরাফও তেমনি এক বিস্ময়কর প্রাণী! তার দীর্ঘ গলার অনন্য আকৃতিই মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর কাছে তাকে আলাদা করে তোলে এবং ছড়িয়ে দেয় অনন্য এক বিস্ময়ের ঝলক।

জিরাফ, জিরাফা গণের অন্তর্গত, একটি বৃহৎ আফ্রিকান খুরওয়ালা স্তন্যপায়ী প্রাণী । এটি পৃথিবীর 
বৃহত্তম রুমিন্যান্ট এবং সবচেয়ে লম্বা স্থলজ প্রাণী। "জিরাফ" নামটির প্রাচীনতম উৎপত্তি আরবি শব্দ জিরাফা ( زِرَافَةْ ) থেকে, যা চূড়ান্তভাবে অস্পষ্ট সাব-সাহারান আফ্রিকান ভাষার উৎপত্তি। জিরাফের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল লম্বা ঘাড়, তাছাড়া এর পা, শিংয়ের মতো অসিকোন এবং দাগযুক্ত আবরণের নকশা করা।  

গলার হাড়ের সংখ্যা নয়, আসল রহস্য লুকিয়ে আছে আকারে! 
মানুষের গলায় যেমন ৭টি সার্ভাইকাল কশেরুকা রয়েছে, জিরাফের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই। কিন্তু পার্থক্যটা প্রতিটি হাড়ের দৈর্ঘ্য ও গঠনে রয়েছে। মানুষের গলার প্রতিটি কশেরুকার দৈর্ঘ্য গড়ে কয়েক সেন্টিমিটার। অন্যদিকে জিরাফের একটি মাত্র গলার হাড়ই মানুষের পুরো গলার দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি হতে পারে। সাতটি হাড় একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হয় প্রায় দুই মিটার দীর্ঘ এক গলা। অর্থাৎ, সংখ্যা না বাড়লেও, বড় হয়েছে প্রতিটি হাড়।

এখানেই আসে বিবর্তনের সূক্ষ্ম সীমাবদ্ধতা। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ক্ষেত্রে গলার কশেরুকার সংখ্যা প্রায় সবসময়ই সাত। ছোট ইঁদুর থেকে শুরু করে বিশাল হাতি, সবার গলাতেই একই সংখ্যা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই সংখ্যায় পরিবর্তন আনলে দেহের স্নায়ু, রক্তনালি ও শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থায় মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে, আকার ও গঠন ভিন্নতা লক্ষণীয়। জিরাফের ক্ষেত্রেও তাই বিবর্তন, হাড়ের সংখ্যা বাড়ায়নি, বরং প্রতিটি হাড়কে দীর্ঘ ও শক্তিশালী করে তুলেছে।

জিরাফের লম্বা গলার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় খাবারের প্রতিযোগিতা। আফ্রিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে নিচু স্তরের খাবার সহজলভ্য হলেও উঁচু গাছের পাতা তুলনামূলক নিরাপদ ও কম প্রতিযোগিতামূলক। যে জিরাফ একটু লম্বা গলা নিয়ে জন্মাত, সে সহজেই উঁচু ডাল থেকে খাবার পেত। ধীরে ধীরে এই বৈশিষ্ট্যই টিকে থাকার সুবিধা হয়ে ওঠে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গলা আরও লম্বা হতে থাকে। এটি বিবর্তনের একটি ক্লাসিক উদাহরণ, যেখানে পরিবেশের চাপ দেহগঠনে পরিবর্তন এনেছে।

শুধু খাবার নয়, গলা শক্তির প্রতীকও! গবেষণায় দেখা গেছে, জিরাফের লম্বা গলার আরেকটি ভূমিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আধিপত্য বিস্তার। বিশেষ করে পুরুষ জিরাফরা একে অপরের সঙ্গে গলা দিয়ে আঘাত করে লড়াই করে। যাদের গলা বেশি লম্বা ও ভারী, তাদের জয়ের সম্ভাবনাও বেশি। এই প্রতিযোগিতাও লম্বা ও শক্ত গলার বিবর্তনকে আরও উৎসাহিত করেছে বলে মনে করা হয়।

এত লম্বা গলায় রক্ত চলাচল কীভাবে সম্ভব?
জিরাফের গলা শুধু লম্বাই নয়, এর ভেতরের শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থা আরও বেশি বিস্ময়কর। মাথা পর্যন্ত রক্ত পৌঁছাতে জিরাফের হৃদপিণ্ডকে প্রচণ্ড শক্তিশালী হতে হয়। তাই জিরাফের রক্তচাপ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। তাছাড়া, গলার রক্তনালিগুলোতে বিশেষ ধরনের ভালভ থাকে, যা মাথা নিচু করলে অতিরিক্ত রক্ত জমে যাওয়া রোধ করে। তা না হলে একবার পানি খেতে ঝুঁকলেই জিরাফ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারত। এখান থেকে বোঝা যায়, গলা লম্বা হয়েছে বলেই শুধু নয়, পুরো দেহব্যবস্থাই সে অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।

স্নায়ু ও নড়াচড়ার সূক্ষ্ম সমন্বয়:
জিরাফের গলায় থাকা স্নায়ুগুলো মানুষের মতোই বিন্যাসে সাজানো, দৈর্ঘ্যে শুধুমাত্র অনেক বড়। একটি স্নায়ু মাথা থেকে বুকে গিয়ে আবার ফিরে আসে, এই পথ জিরাফের ক্ষেত্রে কয়েক মিটার দীর্ঘ। তবু সংকেত পৌঁছাতে দেরি হয় না। কারণ স্নায়ুগুলো মোটা ও দক্ষভাবে সংকেত পরিবহন করতে সক্ষম। এটি দেহের অভ্যন্তরীণ অভিযোজনের আরেকটি প্রমাণ।

অনেক পাঠ্যবই বা জনপ্রিয় কথায় শোনা যায়, জিরাফের গলায় বেশি হাড় থাকে। বাস্তবতা তার ঠিক উল্টো। এই ভুল ধারণা দেখায়, চোখে দেখা জিনিস সবসময় সত্যের প্রতিফলন নয়। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে থাকে সেই জায়গাতেই, যেখানে আমরা সবচেয়ে কম প্রশ্ন করি। জিরাফের গলা তাই শুধু লম্বা নয়, এটি বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। আর অনেক শারীরিক গঠন আমরা স্বাভাবিক ধরে নিলেও, তার পেছনে থাকে দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাস ও জটিল সীমাবদ্ধতা

সম্পর্কিত নিউজ