খরা, লবণাক্ততা, রোগের আক্রমণ- সব বাধা পেরোতে কৃষিকে নতুন দিশা দিচ্ছে সিনথেটিক বায়োলজি !

খরা, লবণাক্ততা, রোগের আক্রমণ- সব বাধা পেরোতে কৃষিকে নতুন দিশা দিচ্ছে সিনথেটিক বায়োলজি !
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে খাদ্যের চাহিদা, অথচ কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য জমি। তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা আরও ঝুঁকিতে ফেলছে ফসল উৎপাদনকে। এই বাস্তবতায় শুধু ঐতিহ্যবাহী কৃষি পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এ কথা বিজ্ঞানীরাও এখন অকপটেই স্বীকার করছেন। ঠিক এই সংকটের মধ্যেই কৃষিতে নতুন এক বৈপ্লবিক ধারণা হিসেবে উঠে এসেছে সিনথেটিক বায়োলজি। এটি জীববিজ্ঞানের গভীর জ্ঞান, প্রকৌশল চিন্তা আর তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এমন একটি শাখা, যা কৃষিকে শেখাচ্ছে, কীভাবে প্রকৃতির ভেতর থেকেই আরও দক্ষ সমাধান তৈরি করা যায়।

সিনথেটিক বায়োলজি আসলে কী
সহজে বতে গেলে, সিনথেটিক বায়োলজি হলো জীবনের উপাদানগুলোকে সঠিকভাবে বুঝে, নতুনভাবে সাজিয়ে, নির্দিষ্ট কাজে ব্যবহার করার বিজ্ঞান। এখানে জীবকে শুধু পর্যবেক্ষণ করা হয় না, বরং তার ভেতরের জৈবিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিতভাবে নকশা করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে এর মানে, উদ্ভিদকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে খরা, বেশি গরম-বৃষ্টি বা রোগবালাই এলেও তারা সহজে নষ্ট না হয়ে টিকে থাকতে পারে। মাটির ভেতরে থাকা উপকারী অণুজীবগুলোকেও কাজে লাগানো হয়, যাতে মাটি আরও উর্বর থাকে এবং গাছ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। এতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরতাও কমে যায়। ফলে খরচ কমে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি ফসলকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়, যাতে আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে। 

কৃষিতে সিনথেটিক বায়োলজি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? 

বিশ্বব্যাপী কৃষি আজ তিনটি বড় চাপে আছে-

১। জলবায়ু পরিবর্তন: অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, অতিরিক্ত তাপ।

২। মাটির অবক্ষয়: দীর্ঘদিন রাসায়নিক সার ব্যবহারে মাটির প্রাণশক্তি কমে যাওয়া।

৩। খাদ্য নিরাপত্তা: জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর চাপ।

সিনথেটিক বায়োলজি এই তিনটি সমস্যাকেই একসঙ্গে মোকাবিলার সম্ভাবনা তৈরি করছে।

মাটির নিচে অণুজীবের পুনর্গঠন:
মাটিতে থাকা অণুজীব কৃষির অদৃশ্য কর্মী। তারা পুষ্টি ভাঙে, গাছের শিকড়কে সহায়তা করে, রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। সিনথেটিক বায়োলজির মাধ্যমে এই অণুজীবগুলোকে আরও কার্যকরভাবে শেখানো হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু ব্যাকটেরিয়াকে এমনভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে তারা বাতাস থেকে নাইট্রোজেন ধরে গাছের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। ফলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন কমে মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় না। এটি কৃষিকে আবার প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার একটি আধুনিক পথ।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হয় কৃষকরা। অতিরিক্ত লবণাক্ত মাটি, দীর্ঘ খরা বা অস্বাভাবিক গরমে অনেক ফসলই নষ্ট হয়ে যায়। সিনথেটিক বায়োলজির মাধ্যমে উদ্ভিদের ভেতরের কিছু জৈবিক প্রক্রিয়া এমনভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে, যাতে কম পানিতে গাছ বেঁচে থাকতে পারে। আবার অতিরিক্ত লবণও সহ্য করতে পারে এবং উচ্চ তাপমাত্রাতেও ফলন ধরে রাখতে পারে।এখানে সিনথেটিক বায়োলজির লক্ষ্য কোনো ফসলকে তার স্বাভাবিক সীমার ভেতরেই আরও অভিযোজিত করা।

কীটনাশক ফসল বাঁচালেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সিনথেটিক বায়োলজি এই জায়গায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে উদ্ভিদকে এমন সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে যে পোকা আক্রমণ করলে গাছ নিজেই প্রতিরোধী উপাদান তৈরি করতে পারে। আবার কিছু অণুজীব ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ক্ষতিকর পোকাকে দমন করে কিন্তু উপকারী পোকাকে ক্ষতি করে না। এর ফলে কৃষি আরও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠছে।

ফলনের পাশাপাশি পুষ্টিগুণ বাড়ানোর চেষ্টা!
আজকের কৃষির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, পরিমাণ বাড়লেও পুষ্টিগুণ কমে যাওয়া। সিনথেটিক বায়োলজি এই জায়গাতেও কাজ করছে। গবেষণার মাধ্যমে ফসলে নির্দিষ্ট ভিটামিন বা খনিজ উপাদানের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয়। উদ্ভিদের নিজস্ব বিপাক প্রক্রিয়া এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে খাবার হয় আরও পুষ্টিকর। এর লক্ষ্য শুধু বেশি খাবার নয়, ভালো খাবার উৎপাদন।

কৃষকের জন্য কী বদলাবে?
এই প্রযুক্তি কৃষককে বিজ্ঞানী বানিয়ে ফেলবে না ঠিকই, কিন্তু কৃষিকে আরও পূর্বাভাসভিত্তিক ও স্থিতিশীল করবে। ফলে ভবিষ্যতের কৃষিতে কম ইনপুটে বেশি ফলন সম্ভব হতে পারে। আবহাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমবে পাশাপাশি মাটির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা বজায় থাকবে। তবে এই প্রযুক্তি যেন শুধু বড় কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

নৈতিকতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন!
সিনথেটিক বায়োলজি যতটা সম্ভাবনাময়,  ঠিক ততটাই সংবেদনশীল। জীবনের গঠন নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে, জীববৈচিত্র্যের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে, কৃষক ও ভোক্তার অধিকার সুরক্ষা নিয়ে। আর এই কারণেই বিজ্ঞানীরা জোর দিচ্ছেন স্বচ্ছতা, নিয়ন্ত্রণ ও ধাপে ধাপে প্রয়োগের ওপর।

উন্নয়নশীল দেশের জন্য সুযোগ ও সতর্কতা!
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের জন্য সিনথেটিক বায়োলজি একদিকে বড় সুযোগ, অন্যদিকে বড় দায়িত্ব। লবণাক্ততা, বন্যা, খরা-এইসব বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানে এটি কার্যকর হতে পারে। তবে প্রয়োজন স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানানসই গবেষণা এবং  কৃষকের বোঝাপড়া ও অংশগ্রহণ পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্যায়ন। নইলে প্রযুক্তি উপকারের বদলে নতুন বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

সিনথেটিক বায়োলজি এমন এক বিজ্ঞান, যা মাঠের বাস্তব সমস্যার উত্তর খুঁজছে ল্যাবের ভেতর, আবার ল্যাবের ধারণাকে মাঠে পরীক্ষা করছে বাস্তবতার আলোতে। ভবিষ্যতের কৃষি শুধু ট্র্যাক্টর বা সারনির্ভর হবে না। হবে জ্ঞাননির্ভর, সূক্ষ্মভাবে নকশা করা এবং পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ। খাদ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে হলে, সিনথেটিক বায়োলজি হতে পারে কৃষির নতুন শিক্ষণীয় অধ্যায়।

সম্পর্কিত নিউজ