{{ news.section.title }}
রাতের অতিথি রহস্যময় কাদুপুল ফুল-আলোয় মিলিয়ে যায়, সংরক্ষণও অসম্ভব!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
রাতের গভীর নিস্তব্ধতায়, যখন চারপাশ ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আলো-ঝলকানি ছাড়াই নিঃশব্দে প্রকৃতির এক বিরল নাটক মঞ্চস্থ হয়, ফোটে কাদুপুল ফুল। এটি একটি নিশাচর ফুল। সূর্যের আলো নয়, বরং অন্ধকারই এই ফুলের জন্মক্ষণ। আর জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, ভোরের প্রথম আলো স্পর্শ করতে এই ফুল ঝরে পড়ে, যেন তার অস্তিত্ব ছিল কেবল রাতের জন্যই। ফলে যারা সঠিক সময়ে উপস্থিত থাকেন না, তাদের কাছে এই ফুল দেখা কেবল গল্প হয়ে থেকে যায়। এই অদ্ভুত জীবনচক্রের জন কাদুপুলকে পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ও ক্ষণস্থায়ী ফুলগুলোর একটি বলা হয়।
কাদুপুল ফুল, যাকে কুইন অব দ্য নাইট নামেও ডাকা হয়। এটি একটি উষ্ণমণ্ডলীয় রেইনফরেস্টজাত উদ্ভিদ, যা ভারত, দক্ষিণ আমেরিকা ও মেক্সিকোর কিছু অঞ্চলে পাওয়া যায়। এটি মূলত একটি ক্যাকটাসজাতীয় উদ্ভিদের ফুল, যা সাধারণত শুষ্ক আবহাওয়ার উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত।বৈজ্ঞানিকভাবে কাদুপুল ফুলের নাম Epiphyllum oxypetalum। এটি কোনো সাধারণ বাগানের ফুল নয় বরং বিশেষ পরিবেশে বেড়ে ওঠে এবং বছরের খুব নির্দিষ্ট সময়েই ফুল দেয়। এর ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য ও প্রায় অলৌকিক কোমলতার জন্য, এটি বিশ্বজুড়ে উদ্ভিদবিদ, উদ্যানতত্ত্ববিদ এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের গভীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।এই ফুলের আদি নিবাস হলো শ্রীলঙ্কার রেইনফরেস্ট। দেশটির জীবনধারা ও লোকবিশ্বাসে কাদুপুল ফুল প্রেম ও ধর্মীয় অনুভূতির সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এটি সেজন্যই সেখানে একটি প্রতীকী ও সম্মানিত ফুল।
এ ফুলকে অন্য সব ফুল থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি, তা হলো এর ব্যতিক্রমী প্রস্ফুটন-প্যাটার্ন। এটি শুধুমাত্র রাতের বেলায় ফোটে এবং ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এর পাপড়িগুলো ঝিমিয়ে পড়ে, যা এই ফুলের ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই স্বল্পস্থায়ী সৌন্দর্যের কারণেই কাদুপুলকে অনেক দেশে “Queen of the Night” নামে ডাকা হয়। কিন এর কারণ শুধু রাতেই ফোটা নয়, বরং ফুল ফোটার সময় এটি যে দৃশ্য ও সুগন্ধ ছড়ায় তা রাজকীয়। মধ্যরাতে ফুলটি সম্পূর্ণ ফোটার সময় এর বড়, সাদা পাপড়িগুলো চাঁদের আলোয় আলতোভাবে ঝলমল করে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক ধরনের হালকা, নির্মল সুবাস, যা খুব বেশি তীব্র নয়, আবার অগ্রাহ্য করার মতোও নয়। এর বিরলতা এবং দেখার সীমিত সুযোগ ফুলটির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুল হিসেবে পরিচিত করেছে।
প্রকৃতির প্রতিটি অদ্ভুত ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো যুক্তিসঙ্গতকারণ থাকে। কাদুপুলের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। এই ফুলের জীবনচক্র রাতকেন্দ্রিক হওয়ার পেছনে রয়েছে পরিবেশগত ও জৈবিক কারণ। রাতে ফোটা ফুল সাধারণত রাতচরা পরাগবাহীদের ওপর নির্ভরশীল। যেমন,নির্দিষ্ট প্রজাতির পতঙ্গ, বাদুড়, যারা রাতেই সক্রিয়। কাদুপুলের সুবাস ও উজ্জ্বল সাদা রং অন্ধকারে এসব পরাগবাহীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ভোরের আলো ফুটতেই এই পরাগায়নের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়। উদ্ভিদের যাতে অপ্রয়োজনীয় শক্তি ব্যয় না হয়, তাই তখন ফুল ঝরে পড়ে। এই ক্ষণস্থায়ী জীবন আসলে শক্তি সঞ্চয়ের একটি কৌশলনীতি মাত্র ।
কাদুপুল দুর্লভ হওয়ার প্রধান কারণ হলো এর ফুল ফোটার সময় ও স্থায়িত্ব। নির্দিষ্ট আবহাওয়া ও পরিবেশে বছরে খুব অল্প কয়েকবারই ফুল দেয় এই গাছটি। আবার ফুল ফোটার সময় সাধারণত মধ্যরাত, যখন অধিকাংশ মানুষই ঘুমিয়ে যায়। এছাড়া আরেকটি রহস্যময় ব্যাপার হলো এই ফুল গাছ থেকে কেটে সংরক্ষণ করা যায় না। কেটে নিলেই পরই মরে যায়। ফলে বাজারে বিক্রি করা বা প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। অর্থের দামে নয়, বরং তার অপ্রাপ্যতার কারণে তাই কাদুপুলকে প্রায়ই অমূল্য ফুল বলা যায় ।
কাদুপুল ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো চিরস্থায়ী নয়। এই ফুল শেখায়, সৌন্দর্য মানে দীর্ঘস্থায়িত্ব নয়। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে গভীর অভিজ্ঞতাগুলোই সবচেয়ে অল্প সময়ের জন্যই আসে। যারা কাদুপুল ফোটার মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা প্রায়ই বলেন, এই অভিজ্ঞতা চোখে দেখার চেয়ে অনুভব করার বিষয় বেশি।
কাদুপুল নিয়ে মানুষের কৌতূহল যুগ যুগ ধরে। অনেকেই এই ফুল দেখতে সারারাত জেগে থাকেন এমন নজিরও পাওয়া গেছে। কেউ কেউ এটিকে জীবনের বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন- প্রথম সাফল্য, গভীর উপলব্ধি বা আত্মিক প্রশান্তির প্রতীক হিসেবে। এমনও দেখা যায়, যারা একবার এই ফুল ফোটার দৃশ্য দেখেছেন, তারা তা ভুলতে পারেন না। কারণ এখানে কোনো পুনরাবৃত্তি নেই। আজ যে ফুল ফুটল, আগামীকাল হয়তো আর ফুটবে না। এই অনিশ্চয়তাই কাদুপুলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
উদ্ভিদজগৎ কতটা সূক্ষ্মভাবে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়,কাদুপুল যেন তার ই প্রতীক। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট সমন্বয় না হলে এই ফুল আবার ফোটেও না। এটি গবেষকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে দেখা যায় কীভাবে উদ্ভিদ তাদের প্রজনন কৌশল সময় ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নেয়। আজকের দ্রুতগতির জীবনে আমরা আমাদের সুখ, সাফল্য, সম্পর্ক সবকিছু ধরে রাখতে চাই। । কিন্তু কাদুপুল যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দেয় সবকিছু ধরে রাখা যায় না, আর সেটাই একদম স্বাভাবিক।
কাদুপুল ফুলের জীবন মাত্র কয়েক ঘণ্টার। কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। আমাদের জীবনও কিন্তু অনেকটা এমনই। সবকিছু দীর্ঘদিন থাকে না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তা অর্থহীন। মধ্যরাতে ফোটা এই ফুল ভোরের আলোয় ঝরে যায় ঠিকই, কিন্তু রেখে যায় এক গভীর উপলব্ধি- সৌন্দর্য মানে মালিকানা নয়, সৌন্দর্য মানে মুহূর্তকে সম্মান করা। আর হয়তো এ কারণেই কাদুপুল পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফুল নয়, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান ফুলগুলোর একটি। কারণ একে দেখা যায় না ইচ্ছেমতো, পাওয়া যায় না চাইলেই, আর ভুলে যাওয়া যায় না একবার দেখলে।