‘আমাকে হত্যা করা হলে ইরান নজিরবিহীন জবাব পাবে’-কঠোর হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

‘আমাকে হত্যা করা হলে ইরান নজিরবিহীন জবাব পাবে’-কঠোর হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইরান যদি তাকে হত্যার চেষ্টা করে বা সফল হয়, তাহলে তেহরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন সামরিক হামলা চালানোর নির্দেশ আগেই দিয়ে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের জবাব হবে এতটাই ব্যাপক যে, ইরান আগে কখনো তেমন হামলার মুখোমুখি হয়নি। এ মন্তব্যের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি বহু বছর ধরেই ইরানের লক্ষ্যবস্তু। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। তাঁর ভাষায়, “আমি অনেক দিন ধরেই তাদের হিটলিস্টে আছি। যদি আমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে আক্ষরিক অর্থেই ইরানের ওপর এমন মাত্রায় বোমাবর্ষণ করা হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি।”


সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, “ইরান যদি আমাকে হত্যা করে, তাহলে আশা করি আপনারা আমাকে মিস করবেন।” তাঁর এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে যেমন ইরানের প্রতি কঠোর বার্তা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতিরও একটি ইঙ্গিত।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পেছনে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে আসছেন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ট্রাম্পকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করে।


মার্কিন বিচার বিভাগও এর আগে অভিযোগ করেছিল, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার চেষ্টা করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও তেহরান সব সময়ই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।


২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় পেনসিলভানিয়ার বাটলারে এক সমাবেশে ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই হামলায় একটি গুলি তাঁর কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে যায় এবং একজন সমর্থক নিহত হন। পরে মার্কিন কর্তৃপক্ষ আরও কয়েকটি সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার দাবি করে। যদিও এসব ঘটনার সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।


এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, আঞ্চলিক সামরিক উপস্থিতি এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে উভয় পক্ষের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।


ট্রাম্প সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দেন, কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও তিনি কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চান না। তাঁর দাবি, ইরান আবারও আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছে এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোও সক্রিয় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কাতার ও ওমানসহ কয়েকটি দেশ উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় ভূমিকা পালন করছে।


বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য মূলত প্রতিরোধমূলক বার্তা। এর মাধ্যমে তিনি ইরানকে জানিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নেতৃত্ব সম্ভাব্য যেকোনো হামলার জবাবে সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, কারণ জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু বরাবরই মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


অন্যদিকে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যের জবাব দেয়নি। তবে দেশটির কর্মকর্তারা অতীতেও বারবার বলে এসেছেন, ইরান কোনো ধরনের সামরিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকলেও অন্যদিকে উভয় পক্ষের কড়া বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, তা শুধু এই দুই দেশের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


সম্পর্কিত নিউজ