তামিলনাড়ুর ৪৯ বছরের রেকর্ড ভেঙে চমক দিলেন বিজয়

তামিলনাড়ুর ৪৯ বছরের রেকর্ড ভেঙে চমক দিলেন বিজয়
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

নিজের প্রথম নির্বাচনেই তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র জগতে যিনি ‘থালাপতি বিজয়’ নামে বেশি পরিচিত। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে তার দল তামিলাগা ভেট্রি কাজগমের (টিভিকে) চমকপ্রদ উত্থান এখন ভারতের রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয়। ২০২৪ সালে আত্মপ্রকাশ করা দলটি প্রথম বিধানসভা নির্বাচনেই ১০৮টি আসনে জয় পেয়ে রাজ্যের একক বৃহত্তম দল হিসেবে সামনে এসেছে।

তামিলনাড়ুর ২৩৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ আসন। সেই হিসাবে টিভিকে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলেও দলটি এখন সরকার গঠনের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছোট দল বা নির্দলীয়দের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে সরকার গঠন নিয়ে তার রাজনৈতিক তৎপরতাও বাড়তে দেখা গেছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর তিনি সামাজিক সংস্কারক পেরিয়ার ই. ভি. রামাসামি ও ড. বি. আর. আম্বেদকরের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান, যা তার নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীকী বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

 

চলচ্চিত্র থেকে রাজনীতিতে এসে দল গঠন, তারপর প্রথম বড় নির্বাচনে শক্তিশালী ফল-তামিলনাড়ুর ইতিহাসে এমন ঘটনা খুবই বিরল। এর আগে ১৯৭৭ সালে তামিল সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা এম. জি. রামাচন্দ্রান বা এমজিআর নিজের রাজনৈতিক দল এআইএডিএমকে গঠন করে নির্বাচনে বড় সাফল্য পান এবং তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন। ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজ্যের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছিলেন।

 

পরবর্তী সময়ে তামিল সিনেমার আরেক জনপ্রিয় মুখ জে. জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রী হলেও তার রাজনৈতিক পথ ছিল ভিন্ন। তিনি নিজে নতুন দল গঠন করেননি; বরং এমজিআরের প্রতিষ্ঠিত এআইএডিএমকে-তে যোগ দিয়ে ধীরে ধীরে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৯১ সালে তিনি প্রথমবার তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন এবং পরবর্তী সময়ে রাজ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করেন।

 

তাই বিজয়ের এই সাফল্যকে অনেকেই এমজিআরের রাজনৈতিক মডেলের সঙ্গে তুলনা করছেন। কারণ দুই ক্ষেত্রেই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা, বিশাল ভক্তসমর্থন এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি রাজনীতির শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এমজিআর যেমন নিজের ভক্তশ্রেণিকে রাজনৈতিক কর্মী ও ভোটারে রূপান্তর করেছিলেন, বিজয়ও দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করেছেন।

 

২০০৯ সালের দিক থেকে বিজয় নিজের ভক্তদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। পরে তার ভক্তগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম। শুরুতে এটি সামাজিক ও ভক্তভিত্তিক সংগঠন হিসেবে কাজ করলেও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাড়াতে থাকে। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে এই সংগঠনের কার্যক্রম বিজয়ের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ২০২৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলাগা ভেট্রি কাজগম বা টিভিকে গঠন করেন।

 

এবারের নির্বাচনে টিভিকের ফলাফল শুধু বিজয়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রতিফলন নয়, বরং তামিলনাড়ুর প্রচলিত দ্বিদলীয় রাজনীতির ওপর বড় ধাক্কা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যটির রাজনীতি মূলত ডিএমকে ও এআইএডিএমকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। সেই জায়গায় নতুন দল হিসেবে টিভিকের ১০৮ আসনে জয় তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

ভারতীয় গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, তরুণ ভোটার, নিম্নআয়ের মানুষ এবং চলচ্চিত্রভিত্তিক জনপ্রিয়তার বাইরে বিজয়ের সরাসরি জনসংযোগও এই সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিরুচির মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনেও বিজয় শক্তিশালী ব্যবধানে জয় পেয়েছেন এবং সেখানে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন তার পক্ষে গেছে।

 

তবে সামনে বিজয়ের জন্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রথমত, তাকে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তাকে প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপান্তর করতে হবে। তৃতীয়ত, নতুন দল হিসেবে টিভিকেকে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, বিধানসভায় স্থিতিশীলতা এবং জনআস্থার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।

 

সূত্র : এনডিটিভি


সম্পর্কিত নিউজ