{{ news.section.title }}
হঠাৎ বুকে ব্যথা হলে যা করবেন
- Author, জাগরণ নিউজ ডেস্ক
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
প্রায় প্রত্যেক মানুষই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বুকে হালকা বা মাঝারি ব্যথা অনুভব করে থাকেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা এই ব্যথাকে অ্যাসিডিটির সমস্যা ভেবে অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ খেয়ে নিশ্চিন্ত হই। কিন্তু কেবল অনুমানের ওপর ভর করে বুকের ব্যথার চিকিৎসা করা সব সময় নিরাপদ নয়। হঠাৎ বুকে ব্যথা হলে কী করণীয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেক সময় মানুষ হার্ট অ্যাটাকের মতো মারাত্মক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
বুকে ব্যথা অনুভূত হলে প্রথমে এর সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। কারণ বুকে ব্যথার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে এবং কারণভেদে চিকিৎসাও ভিন্ন হয়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক জটিলতা বাড়ছে এবং বর্তমান সময়ে হৃদরোগের ঝুঁকি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এ কারণে বুকে ব্যথা হলে একে সরাসরি অ্যাসিডিটির সমস্যা ভেবে অবহেলা না করে কিছুটা সময় নিয়ে লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে সেলফ মেডিকেশনের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। কিছু শারীরিক সমস্যাকে আমরা গৎবাঁধা ধারণার মধ্যে ফেলে দিই। বুকের ব্যথার ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। সত্যি বলতে, অ্যাসিডিটির কারণে বুকে জ্বালাপোড়া বা প্রদাহজনিত ব্যথা হতে পারে। তবে বুকে যদি চিনচিনে বা চাপা ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে তা কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।
বুকে ব্যথার কারণ বহুবিধ হলেও এর পরিণতি হিসেবে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। সম্প্রতি বিশ্ব হৃদ্যন্ত্র দিবসে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন মানবদেহে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, অক্সিজেন প্রবাহ কমে যায় এবং নানা জটিলতা দেখা দেয়। এসব কারণেই হৃদরোগের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।
নিকট অতীতে জনপ্রিয় গায়ক কেকে বুকে ব্যথা থেকে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বুকের ব্যথাকে গুরুত্ব না দিলে প্রাণঘাতী পরিণতি হতে পারে। অথচ সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বুকে ব্যথা অস্বাভাবিক মনে হলেই দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে প্রথম ১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেরি হলে তার খেসারত রোগীকেই দিতে হয়।
বুকে ব্যথার কিছু কারণ সরাসরি হৃদরোগের ইঙ্গিত দেয়। যেমন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, যেখানে হার্টে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। মায়োকার্ডাইটিস, অর্থাৎ হৃদযন্ত্রের পেশিতে প্রদাহ। পেরিকার্ডাইটিস, হার্টের থলিতে প্রদাহজনিত তীব্র ব্যথা। করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা এনজাইনা, যেখানে হৃদপিণ্ডের রক্তনালিতে ব্লকেজ সৃষ্টি হয়। মাইট্রাল ভালভ প্রল্যাপস, যখন মাইট্রাল ভালভ ঠিকভাবে বন্ধ হয় না। এওর্টিক বিচ্ছেদ, একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক অবস্থা, যেখানে এওর্টা ছিঁড়ে যায়। এছাড়া ব্রঙ্কোস্পাজম, পালমোনারি এমবোলিজম কিংবা গুরুতর অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে বুকে ব্যথা হতে পারে।
তবে এটাও সত্য যে, বুকে ব্যথা মানেই হৃদরোগ নয়। চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই বুকের ব্যথার পেছনে হৃদরোগ ছাড়া অন্যান্য কারণ কাজ করে। তাই বুকে ব্যথা হলে শরীরের অন্যান্য লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসকের কাছে সঠিকভাবে উপসর্গ তুলে ধরা জরুরি।
অ্যাসিডিটির কারণে বুকে ব্যথা হলে সাধারণত তেল-মশলাযুক্ত খাবার বা ভাজাভুজি খাওয়ার পর জ্বলানি অনুভূত হয়, যা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। ঢেঁকুরের সঙ্গে বুকে জ্বালা থাকলে অ্যান্টাসিডে উপকার পাওয়া যায়। খাদ্যনালীর সমস্যায় গিলতে কষ্ট হয় এবং বুকে ব্যথা দেখা দেয়। আবার অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা পরিশ্রমের সময় এফর্ট এনজাইনার কারণে সাময়িক বুকে ব্যথা হতে পারে, যা বিশ্রামে সেরে যায়। ফুসফুসে সংক্রমণ, বুকের মাংসপেশি বা পাঁজরের সমস্যায় এবং আঘাতের কারণে বুকের ব্যথা হতে পারে। পাশাপাশি যারা দীর্ঘদিন দুশ্চিন্তা, হতাশা বা প্যানিক ডিজর্ডারে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রেও বুক ধড়ফড় ও ব্যথার উপসর্গ দেখা যায়।
কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ থাকলে বুঝতে হবে হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে। যেমন বুকে হঠাৎ তীব্র চাপ বা অসহ্য ব্যথা অনুভব হওয়া। চিনচিনে ব্যথার সঙ্গে শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া। বুকের ব্যথা হাত, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া। মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, ঠান্ডা ঘাম। রক্তচাপ বা হার্টরেট কমে যাওয়া। প্রচণ্ড ক্লান্তি ও হাঁটতে না পারার অনুভূতি। এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলে প্রাথমিকভাবে কিছু সতর্কতা নেওয়া যেতে পারে। সন্দেহ হলে ৩০০ মিলিগ্রাম এসপিরিন বা ডিসপিরিন গ্রহণ করা যেতে পারে। যাদের হার্টের সমস্যা রয়েছে তারা চিকিৎসকের পরামর্শে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। বুকে টান বা মাংসপেশির ব্যথায় কোল্ড প্যাক সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। এ সময় অতিরিক্ত নড়াচড়া না করে মাথা সামান্য উঁচু করে শুয়ে থাকা নিরাপদ। ধূমপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে এবং নিজের অবস্থা কারো সঙ্গে জানানো জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, বুকে ব্যথা যদি হৃদরোগজনিত হয়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা নেওয়াই একমাত্র নিরাপদ পথ। হার্ট অ্যাটাক শুধু প্রাণঘাতী নয়, আজীবন জটিলতার কারণও হতে পারে। হৃদরোগ নিশ্চিত হলে জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ সামলে রাখা এবং ধূমপান পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সময়ে হৃদরোগ একটি বড় আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। তাই বুকে ব্যথা হলে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।