লিভার নষ্ট হয় ধীরে, ধরা পড়ে দেরিতে - লক্ষণ, প্রকোপ, প্রতিকার!

লিভার নষ্ট হয় ধীরে, ধরা পড়ে দেরিতে - লক্ষণ, প্রকোপ, প্রতিকার!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক কারখানা হলো লিভার বা যকৃৎ। খাবার হজম থেকে শুরু করে রক্তকে বিষমুক্ত করা, হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চয়, সবই সামলায় এই অঙ্গটি। কিন্তু লিভারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ও আশঙ্কার দিক হলো, এটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করলেও সচরাচর কোনো স্পষ্ট সংকেত দেয় না। আর এই কারণেই লিভারের অসুখকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সাইলেন্ট কিলার বা নীরব ঘাতক বলা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভারের রোগ কেবল লক্ষণ চেনা নয়, বরং এর সঠিক কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা থাকা জীবন রক্ষার সমতুল্য। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন এবং সচেতনতার অভাবে আমাদের অজান্তেই এই জীবনীশক্তি প্রদানকারী অঙ্গটি অকেজো হয়ে পড়তে পারে। লিভারের রোগের ধরন, এর লক্ষণগুলো চিনে নেওয়ার উপায় এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব নিয়েই আমাদের আজকের এই স্বাস্থ্য প্রতিবেদন।


লক্ষণ:
প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলো সাধারণ ও অস্পষ্ট হয়।

যেমন:
☞ অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা

☞ ক্ষুধামন্দা, বমিভাব

☞ হালকা পেটব্যথা (ডান পাশে)

☞ ওজন কমে যাওয়া

রোগ বাড়লে স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয়।যেমন :

☞ ত্বক ও চোখ হলুদ হওয়া (জন্ডিস)

☞ পেট ফুলে যাওয়া (পেটে পানি জমা)

☞ পা ও গোড়ালি ফুলে ওঠা

☞ ত্বকে চুলকানি

☞ গাঢ় রঙের প্রস্রাব, ফ্যাকাশে মল

☞ সহজে রক্তক্ষরণ, নাক দিয়ে রক্ত পড়া

☞ মানসিক বিভ্রান্তি, ঘুম ঘুম ভাব (রক্তে বিষাক্ত পদার্থ জমার প্রভাব)

প্রকোপ:
লিভার ডিজিজের প্রধান কারণগুলো হলো-

☞ অতিরিক্ত তেল-চর্বি ও চিনিযুক্ত খাবার, স্থূলতা

☞ ডায়াবেটিস ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন

☞ অ্যালকোহল সেবন

☞ ভাইরাল হেপাটাইটিস সংক্রমণ

☞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা ভেষজ সেবন

☞ দূষিত রক্ত সঞ্চালন বা অনিরাপদ ইনজেকশন

☞ দীর্ঘদিন লিভারে চর্বি জমা (ফ্যাটি লিভার)

এসব কারণে লিভার কোষে প্রদাহ হয়, পরে দাগ পড়ে (ফাইব্রোসিস), এবং শেষ পর্যন্ত সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।

প্রতিকার:
লিভার সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলো হলো-

⇨ জীবনযাপনে পরিবর্তন

⇨ ভাজাপোড়া, প্রসেসড খাবার, কোমল পানীয় কমানো

⇨ নিয়মিত শাকসবজি, ফল, আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া

⇨ পর্যাপ্ত পানি পান

⇨ প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম

⇨ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা

⇨ অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা

⇨ প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ না খাওয়া

⇨ ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধে টিকা গ্রহণ

⇨ পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চলা

চিকিৎসা:
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন ও পর্যায়ের ওপর।

☞ ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো, ব্যায়ামই প্রধান চিকিৎসা।

☞ হেপাটাইটিস এর জন্য দরকার নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।

☞ সিরোসিস হলে প্রয়োজন হয় জটিলতা নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি নিশ্চিত করা, পেটে পানি বা রক্তক্ষরণ সামাল দেওয়া।

☞ লিভার ফেইলিওর হলো শেষ পর্যায়। এসময় লিভার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে লিভার অনেক ক্ষেত্রেই নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে।

লিভার ডিজিজের বড় সমস্যা হলো,লক্ষণ দেরিতে প্রকাশ পায়। তাই ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা জরুরি। লিভারের যত্ন মানেই পুরো শরীরের যত্ন। সময়মতো সচেতনতা, প্রতিকার ও চিকিৎসাই পারে এই নীরব রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
 


সম্পর্কিত নিউজ