বারবার ভুলে যাওয়া কোন রোগের সংকেত? স্মৃতি হারানো নিয়ে অবহেলা যখন বিপজ্জনক

বারবার ভুলে যাওয়া কোন রোগের সংকেত? স্মৃতি হারানো নিয়ে অবহেলা যখন বিপজ্জনক
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

চশমাটা কোথায় রেখেছেন মনে পড়ছে না, কিংবা খুব পরিচিত একজনের নাম হয়তো জিহ্বার ডগায় এসেও আটকে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন পেটে আছে কিন্তু মুখে আসছে না! এমনটা আমাদের সবার সাথেই কমবেশি ঘটে। আমরা একে বয়সের সাধারণ ধর্ম বা কাজের চাপ মনে করে উড়িয়ে দিই। কিন্তু যখন এই ভুলে যাওয়াটা কেবল চাবি হারানোতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং প্রিয়জনের মুখ চেনা, কথা বলার খেই হারিয়ে ফেলা কিংবা নিজের ঘরের পথ ভুলে যাওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন বুঝতে হবে এটি সাধারণ ভুলোমনা নয়। এটি হতে পারে আলঝেইমার’স ডিজিজ, মস্তিষ্কের এক অত্যন্ত জটিল ও নিঃশব্দ অবক্ষয়।

আলঝেইমার’স ডিজিজ কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, আলঝেইমার’স হলো ডিমেনশিয়ার (Dementia) সবচেয়ে সাধারণ রূপ, যা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। এটি এমন এক নিষ্ঠুর রোগ, যা একজন মানুষের তিল তিল করে জমানো সারাজীবনের স্মৃতি, অর্জিত ভাষা এবং শেষ পর্যন্ত তার নিজস্ব ব্যক্তিত্বকেও একেবারেই মুছে ফেলে। আলঝেইমার’স আক্রান্ত ব্যক্তি কেবল তথ্যই ভোলেন না, বরং জীবনের সাধারণ কাজগুলো করার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন, যা তাকে পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।


মস্তিষ্কে কী ঘটে?
আলঝেইমারে দুই ধরনের অস্বাভাবিক প্রোটিন জমা হতে দেখা যায়।

১। অ্যামাইলয়েড প্লাক (কোষের বাইরে জমে)।

২। টাউ ট্যাঙ্গল (কোষের ভেতরে জট তৈরি করে)।

এই জমাট প্রোটিনগুলো স্নায়ুকোষের মধ্যে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত করে, পুষ্টি পরিবহন ব্যাহত করে, এবং শেষ পর্যন্ত কোষের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটায়।

প্রাথমিক লক্ষণ:
রোগের শুরুতে লক্ষণগুলো খুব সূক্ষ্ম হওয়ায় অনেকেই তা গুরুত্ব দেন না।যেমন-

☞ সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া।

☞ একই প্রশ্ন বারবার করা।

☞ কথা বলতে গিয়ে শব্দ খুঁজে না পাওয়া।

☞ সময় ও জায়গা নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া।

☞ পরিকল্পনা করতে অসুবিধা হওয়া।

ধীরে ধীরে এগুলো বাড়তে থাকে এবং ব্যক্তি দৈনন্দিন কাজেও অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

রোগ বাড়লে যা হয়:
মধ্য ও শেষ পর্যায়ে-

⇨ পরিচিত মানুষকে চিনতে না পারা।

⇨ ভাষা প্রায় হারিয়ে ফেলা।

⇨ আচরণে পরিবর্তন, অস্থিরতা।

⇨ নিজের যত্ন নিতে না পারা।

⇨ খাওয়া, হাঁটা, টয়লেট, সবকিছুতে সহায়তা প্রয়োজন হওয়া।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?
⇨বয়স ৬৫-এর বেশি হলে ঝুঁকি বাড়ে।

⇨ পরিবারে ইতিহাস থাকলে।

⇨ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা।

⇨ দীর্ঘদিন মানসিক চাপ।

⇨ শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা।

⇨ ধূমপান করেন যারা।

আলঝেইমার কি নিরাময়যোগ্য?
এখন পর্যন্ত এ রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়ের কোনো উপায় নেই। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে, কিছু ওষুধ ও থেরাপি আছে, যা রোগের অগ্রগতি ধীর করতে এবং লক্ষণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

প্রতিরোধ:
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু অভ্যাস মস্তিষ্ককে দীর্ঘদিন সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে।যেমন-

⇨ নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম।

⇨ বই পড়া, নতুন কিছু শেখা।

⇨ সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা।

⇨ পর্যাপ্ত ঘুম।

⇨ পুষ্টিকর খাবার, বিশেষ করে শাকসবজি, মাছ, বাদাম।

⇨ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা।

⇨ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা মানে স্নায়ু সংযোগগুলো সচল রাখা।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
যদি ভুলে যাওয়া দৈনন্দিন কাজকে প্রভাবিত করে, পরিবার লক্ষ্য করে আচরণে পরিবর্তন, বা ব্যক্তি নিজেই বিভ্রান্তি অনুভব করেন, তাহলে দ্রুত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্মৃতি পরীক্ষাসহ কিছু মূল্যায়নের মাধ্যমে রোগের উপস্থিতি বোঝা যায়।


সম্পর্কিত নিউজ