সামান্য আঘাতেই ত্বকে কালশিটে? হতে পারে আপনার শরীরের কোনো গুপ্ত রোগের সংকেত!

সামান্য আঘাতেই ত্বকে কালশিটে? হতে পারে আপনার শরীরের কোনো গুপ্ত রোগের সংকেত!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

সকালের ঝলমলে রোদে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছেন, আর হঠাৎ চোখে পড়ল হাত বা পায়ের ত্বকে কালচে বা নীলচে কিছু ছোপ বা দাগ। অবাক লাগছে? আপনি হয়তো ভেবে নিলেন, কখন যেন একটু ধাক্কা লেগেছিল, তারই হয়তো দাগ এটি। কিন্তু বিজ্ঞান এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এই দাগগুলো সবসময় শুধু বাইরের সামান্য আঘাতের ফল নয়, বরং হতে পারে আপনার শরীরের ভেতরের কোনো গভীর সতর্ক সংকেত। প্রতিদিনের ছোট ছোট আঘাত বা চাপও যদি সহজেই দাগের আকারে প্রকাশ পায়, তাহলে আমাদের দেহের রক্তনালি, প্লেটলেট এবং পুষ্টির অবস্থা পরীক্ষা করা খুব জরুরি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ব্রুজ’ (Bruise) বলা হয়। সাধারণত ত্বকের নিচের ক্ষুদ্র রক্তনালী ফেটে রক্ত ছড়িয়ে পড়লে এমন কালশিটে দাগ পড়ে। তবে দুশ্চিন্তার বিষয় তখনই হয়, যখন কোনো বড় চোট ছাড়াই শরীরে বারবার এমন দাগ দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল আঘাতের চিহ্ন নয়, বরং আপনার শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা কোনো পুষ্টিহীনতা বা জটিল রোগের সংকেত হতে পারে।

কেন পড়ে এই রহস্যময় দাগ?

১। জেনেটিক কারণ: অনেকের পরিবারে ছোটবেলাতেই এমন প্রবণতা থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগতভাবে যারা প্লেটলেট কার্যকারিতা কম বা রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কম, তাদের ছোট আঘাতেই দাগ পড়ার প্রবণতা বেশি।

২। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: ফ্রি র‍্যাডিক্যালস শরীরের কোষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানসিক চাপ, দূষণ, অতিরিক্ত UV এক্সপোজার দাগ পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

দেহে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কম হলে রক্তনালি আরও দুর্বল হয়ে যায়।

৩। পুষ্টি অভাব, যেমন-

◑ ভিটামিন C: কোলাজেন উৎপাদনে সাহায্য করে। এর অভাবে রক্তনালি দুর্বল হয়ে পড়ে।

◑ ভিটামিন K: রক্ত জমে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কাজ করে।

◑ জিঙ্ক ও তামা: চামড়া ও রক্তনালিকে দৃঢ় রাখতে সাহায্য  করে।

◑ প্রোটিন ও এমিনো অ্যাসিড: রক্তনালি ও ত্বকের মজবুত গঠনে ভুমিকা রাখে।

৪। হরমোনাল সমস্যা: থাইরয়েড বা অটোইমিউন রোগে সামান্য আঘাতেই দাগ পড়তে পারে।হরমোনজনিত কারণে রক্তনালি দুর্বল হতে পারে।

৫। ঔষধ ও জীবনধারা: অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট বা স্টেরয়েড দীর্ঘকাল ব্যবহার করলে রক্ত পাতলা হয়।

৬। ধূমপান, অ্যালকোহল, অনিয়মিত ঘুম এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপও দাগের ঝুঁকি বাড়ায়।

কখন সতর্ক হওয়া জরুরী?

সাধারণত ছোট আঘাতের দাগ স্বাভাবিক। কিন্তু যদি নিচের লক্ষণ থাকে, তাত্ক্ষণিক চিকিৎসা দরকার-

☞ আঘাত ছাড়াই, হঠাৎ বা বারবার দাগ পড়া।

☞ দাগের সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যথা বা ফোলা।

☞ দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত বা হেমাটোমা।

☞ ত্বক বা চোখে জন্ডিস, দুর্বলতা বা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা।

প্রতিরোধ ও প্রতিকার:

শরীরকে ভেতর থেকে মজবুত করতে এবং এই সমস্যা প্রতিরোধে নিচের পদক্ষেপগুলো কার্যকর।

☞  খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনুন।

◑ ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার, যেমন- লেবু, কমলা, কিউই, ব্রকলি (ভিটামিন সি) এবং পালং শাক, বাদাম ও সবুজ শাকসবজি (ভিটামিন কে) নিয়মিত খান।

◑প্রোটিন অর্থাৎ ডিম, মাছ এবং দুগ্ধজাত খাবার রক্তনালির গঠন মজবুত করে।

◑  পর্যাপ্ত পানি পান রক্তনালিকে সতেজ ও দৃঢ় রাখে।

☞  জীবনধারা: ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করুন। দৈনিক অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন। মানসিক চাপ কমাতে যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন করতে পারেন। নিজ নিজ ধর্মীয় উপাসনাও মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে।

☞ ত্বকের যত্ন: ত্বক ময়েশ্চারাইজড রাখুন এবং কড়া রোদ এড়িয়ে চলুন। কারণ, UV রশ্মি রক্তনালি দুর্বল করে ফেলে।

ত্বকের এই নীল দাগগুলো কেবল সৌন্দর্যের হানি নয়, এটি শরীরের পুষ্টি, প্লেটলেট এবং হরমোনের একটি মানচিত্র। দেহের প্রতিটি ছোট সংকেতকে গুরুত্ব দিলে বড় যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সঠিক পুষ্টি এবং সচেতনতাই পারে আমাদের ত্বক ও অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখতে।


সম্পর্কিত নিউজ