{{ news.section.title }}
শিশুকে মুখে চুমু দিচ্ছেন? বদলে ফেলুন এই অভ্যাস, জানুন আদরের নিরাপদ বিকল্প!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
শিশুর জন্মের পর আনন্দ আর আদরের আতিশয্যে আমরা অনেকেই তাকে চুমু দিয়ে ফেলি। কিন্তু ভালোবাসার এই প্রকাশই কি আপনার আদরের সন্তানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে? চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, বড়দের একটি সাধারণ চুমু নবজাতকের জন্য বয়ে আনতে পারে হারপিস সিমপ্লেক্স (HSV-1), RSV (রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাস) বা মেনিনজাইটিসের মতো ভয়াবহ সব রোগ!
নবজাতকের ছোট্ট মুখ, নরম গাল, ঘুমন্ত নিঃশ্বাস দেখলে আবেগ সামলানো সত্যিই বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। সন্তান, নাতি-নাতনি বা আত্মীয়ের শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই চুমু দিয়ে থাকেন। আমাদের সমাজে এটিই ভালোবাসার প্রকাশ। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই নিরীহ চুমুই নবজাতকের জন্য হয়ে উঠতে পারে মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। চিকিৎসকেরা তাই স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করছেন, নবজাতককে চুমু দেওয়া থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।
যেহেতু জন্মের প্রথম কয়েক মাস শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি বিকশিত হয় না, তাই বড়দের লালা বা নিশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ানো সাধারণ জীবাণুগুলোও তাদের শরীরে খুব দ্রুত বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সামান্য জ্বর বা কোল্ড সোর (ঠোঁটের কোণে ঘা) আছে এমন কেউ শিশুকে চুমু খেলে তা সরাসরি তার মস্তিষ্ক বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়।
মুখ, নাক, চোখ- এই তিনটি পথ দিয়েই সবচেয়ে সহজে জীবাণু শরীরে ঢোকে, আর চুমু দেওয়ার সময় এই তিন জায়গাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে মুখে বা ঠোঁটে চুমু দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ মানুষের মুখগহ্বরে স্বাভাবিকভাবেই অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস বসবাস করে থাকে। অনেক সময় আমরা নিজেরাও জানিন না, আমরা কোনো ভাইরাস বহন করছি কি না। কোনো উপসর্গ ছাড়াই একজন প্রাপ্তবয়স্কের শরীরে ভাইরাস থাকতে পারে, যা তার জন্য ক্ষতিকর না হলেও, নবজাতকের শরীরে ঢুকলে ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটাতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি ভাইরাসের কথা বারবার উঠে আসে, যা বড়দের ক্ষেত্রে সাধারণ ঠোঁটের ফোসকা বা হালকা সমস্যা তৈরি করলেও নবজাতকের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। এই ভাইরাস শিশুর শরীরে ঢুকে রক্ত, মস্তিষ্ক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করতে সক্ষম। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম দিকে লক্ষণ খুবই সাধারণ থাকে। যেমন- হালকা জ্বর, খাওয়ায় অনীহা, অতিরিক্ত কান্না বা নিস্তেজ ভাব। কিন্তু সময়মতো শনাক্ত না হলে পরিস্থিতি দ্রুতই নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। এখানেই বিপদটা সবচেয়ে বেশি। নবজাতক নিজে তার অসুস্থতা বা কষ্টের কথা বলতে পারে না। লক্ষণগুলোও অনেক সময় খুব সাধারণ সমস্যার মতো মনে হয়। ফলে পরিবার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে সময় নষ্ট করে ফেলে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই ধরনের সংক্রমণে কয়েক ঘণ্টার দেরিও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
চুমু ছাড়াও আরও কিছু বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক সময় দেখা যায়, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কেউ সর্দি, কাশি বা জ্বর নিয়েই নবজাতককে দেখতে আসছেন। মুখে মাস্ক নেই, হাত ধোয়ার বিষয়েও থাকেন উদাসীন। এরপর শিশুকে কোলে নিয়ে আদর, চুমু দিতে থাকেন।এতে করে জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। চিকিৎসকেরা স্পষ্টভাবে বলেন, উপসর্গ থাকুক বা না থাকুক, নবজাতকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
নবজাতকের চোখেও চুমু দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। চোখের শ্লেষ্মা ঝিল্লি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য জীবাণু থেকেই চোখে মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে, যা দৃষ্টিশক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে নাক বা কপালে চুমু দেওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অনেকেই মনে করেন,"আমরা তো পরিবারের লোক, আমাদের জীবাণু কীভাবে ক্ষতি করবে!" কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এক্ষেত্রে কোনো আবেগ মানে না। জীবাণুর কাছে আত্মীয়-অনাত্মীয় বলে কিছু নেই। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের দুর্বল, তাদের জন্য ঝুঁকি সবসময়ই বেশি। নবজাতক সেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে।
বিশ্বজুড়ে শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তাই একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন, নবজাতককে আদর করতে চাইলে চুমুর বিকল্প বেছে নিন। কোলে নেওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়া, শিশুর হাত বা পায়ের তলায় আলতো স্পর্শ, মিষ্টি কথা বলার মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশেই হলো নিরাপদ উপায়। ভালোবাসা মানেই শারীরিক সংস্পর্শ হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
মা বাবার ক্ষেত্রেও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। অনেকেই ভাবেন, সন্তানের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ায় মা বাবার চুমু কোনো ঝুঁকি তৈরি করে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মা বাবাও বাইরের জগতের সঙ্গে নিয়মিত সংস্পর্শে থাকেন। কাজের জায়গা, গণপরিবহন, বাজার ইত্যাদি সব জায়গা থেকেই জীবাণু ঘরে আসে। তাই নবজাতকের প্রথম কয়েক সপ্তাহে মা বাবাকেও বাড়তি সতর্ক থাকতে বলেন চিকিৎসকেরা। বিশেষ করে যদি মুখে ফোসকা, জ্বর বা সর্দি-কাশির মতো কোনো উপসর্গ থাকে। এই প্রসঙ্গে নবজাতকের প্রথম এক মাসকে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। এই সময়েই অধিকাংশ গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। পরবর্তী সময়ে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হতে শুরু করে, যদিও তখনও সতর্কতা একেবারে বাদ দেওয়া যায় না।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে, শিশুকে একটু জীবাণুর সঙ্গে পরিচয় করানো দরকার, তা না হলে সে দুর্বল হয়ে যাবে। চিকিৎসাবিজ্ঞান এই ধারণাকে সমর্থন করে না, বিশেষ করে নবজাতকের ক্ষেত্রে। জীবাণুর সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচয় হবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের মাধ্যমেই। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ সংস্পর্শ তৈরি করা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
নবজাতকের সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু মা বাবার নয়, পুরো পরিবারের। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা আশেপাশের সকলকেই বুঝতে হবে, এই সময়ের একটু সংযমই শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। শিশুকে দূর থেকে দেখা, দোয়া করা, শুভকামনা জানানোতে ভালোবাসার ঘাটতি হয় না। বরং এতে শিশুর সুস্থতার পথ আরও নিরাপদ হয়। চিকিৎসকেরা আরও একটি বিষয় জোর দিয়ে বলেন, সচেতনতা মানেই আতঙ্ক নয়। নবজাতক মানেই সবকিছু নিষিদ্ধ, এমন ভাবার কারণ নেই। বরং তথ্য জেনে, বুঝে সিদ্ধান্ত নিলেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। চুমু না দেওয়া মানে শিশুকে ভালোবাসা কম দেওয়া নয়, এটি শিশুর জীবনের প্রতি সবচেয়ে দায়িত্বশীল ভালোবাসার প্রকাশ।