{{ news.section.title }}
দাঁত সুস্থ রাখতে শুধু ব্রাশ করলেই হবে না, জানতে হবে সঠিক নিয়ম
অনেকেই দাঁতের যত্নকে শুধু সৌন্দর্যের অংশ বলে মনে করেন। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য (Oral Health) এবং শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, মুখগহ্বরের রোগ বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ অসংক্রামক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শত শত কোটি মানুষ দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির রোগ, দাঁত হারানো বা মুখের অন্যান্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশ নিয়মিত ও সঠিকভাবে দাঁতের যত্ন নিলে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
American Dental Association (ADA) এবং FDI World Dental Federation-এর মতে, মুখ শুধু খাবার খাওয়ার জন্য নয়; এটি হজম প্রক্রিয়ার শুরু, কথা বলা, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং সামাজিক যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দাঁত বা মাড়ির সমস্যা শুধু মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করলে এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি মাড়ির প্রদাহ (Periodontal Disease) এবং হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, গর্ভাবস্থার কিছু জটিলতা এমনকি কিছু শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মধ্যেও সম্পর্ক থাকতে পারে। যদিও এর সব ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনও গবেষণাধীন, তবুও বিশেষজ্ঞরা একমত যে সুস্থ মুখগহ্বর সামগ্রিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশেও দাঁতের সমস্যাকে অনেক সময় তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ব্যথা শুরু না হওয়া পর্যন্ত অনেকেই দন্ত চিকিৎসকের কাছে যান না। ফলে ছোট একটি সমস্যা ধীরে ধীরে বড় জটিলতায় রূপ নেয়। চিকিৎসকদের মতে, প্রতিরোধমূলক যত্নই দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
মুখের ভেতরে কীভাবে শুরু হয় দাঁতের ক্ষয়, প্লাক ও টারটারের গল্প
অনেকের ধারণা, দাঁত শুধু ঠিকমতো পরিষ্কার না করলে নোংরা হয়। কিন্তু বাস্তবে দাঁতের ওপর সব সময় একটি অদৃশ্য জীবাণুর স্তর তৈরি হতে থাকে, যাকে ডেন্টাল প্লাক (Dental Plaque) বলা হয়।
National Institute of Dental and Craniofacial Research (NIDCR)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্লাক মূলত ব্যাকটেরিয়া, লালা এবং খাবারের অবশিষ্টাংশ দিয়ে তৈরি একটি নরম, আঠালো স্তর। প্রতিবার খাবার খাওয়ার পর, বিশেষ করে চিনিযুক্ত বা শর্করাযুক্ত খাবার খেলে মুখের ব্যাকটেরিয়া সেই খাবার ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড ধীরে ধীরে দাঁতের বাইরের শক্ত আবরণ এনামেল (Enamel) ক্ষয় করতে শুরু করে।
যদি প্রতিদিন সঠিকভাবে ব্রাশ ও পরিষ্কার না করা হয়, তাহলে এই প্লাক দীর্ঘ সময় দাঁতের ওপর জমে থাকে। কয়েক দিনের মধ্যে লালায় থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফেটের সঙ্গে মিশে এটি শক্ত হয়ে ক্যালকুলাস বা টারটার (Calculus/Tartar)-এ পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাক ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করা সম্ভব হলেও একবার টারটার তৈরি হয়ে গেলে সাধারণ ব্রাশ দিয়ে আর তা ওঠে না। তখন দন্ত চিকিৎসকের মাধ্যমে স্কেলিং (Scaling) করিয়ে তা অপসারণ করতে হয়।
কেন শুধু বেশি সময় ব্রাশ করলেই দাঁত পরিষ্কার হয় না
বাংলাদেশে অনেকেই মনে করেন, যত বেশি সময় বা যত জোরে ব্রাশ করা যাবে, দাঁত তত বেশি পরিষ্কার হবে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
American Dental Association-এর মতে, দাঁত পরিষ্কারের ক্ষেত্রে সময়ের পাশাপাশি সঠিক কৌশল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি পাঁচ মিনিট ধরে ভুলভাবে ব্রাশ করেন, তাহলে তার চেয়ে দুই মিনিট ধরে সঠিক নিয়মে ব্রাশ করা অনেক বেশি কার্যকর।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত জোরে ব্রাশ করলে প্লাক খুব একটা বেশি দূর হয় না, বরং মাড়ির ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস থাকলে মাড়ি সরে যেতে পারে (Gum Recession), দাঁতের শিকড় উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে এবং দাঁত ঠান্ডা বা গরমে শিরশির করতে শুরু করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাশ করার লক্ষ্য হওয়া উচিত দাঁতের প্রতিটি অংশ এবং মাড়ির সংযোগস্থল থেকে প্লাক সরানো, দাঁত ঘষে ক্ষয় করা নয়।
শক্ত ব্রিসলের ব্রাশ কি সত্যিই বেশি পরিষ্কার করে?
অনেকেই মনে করেন, শক্ত (Hard Bristle) ব্রাশ ব্যবহার করলে দাঁত আরও ঝকঝকে পরিষ্কার হয়। বাস্তবে আন্তর্জাতিক প্রায় সব দন্তচিকিৎসা সংস্থাই এর বিপরীত পরামর্শ দেয়। ADA, NHS এবং Oral Health Foundation-এর মতে, অধিকাংশ মানুষের জন্য Soft Bristle Toothbrush-ই সবচেয়ে নিরাপদ এবং কার্যকর।
নরম ব্রিসল দাঁতের এনামেল এবং মাড়ির ক্ষতি না করেই প্লাক পরিষ্কার করতে সক্ষম। অন্যদিকে শক্ত ব্রাশ দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে দাঁতের এনামেল ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে এবং মাড়ির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের দাঁত সংবেদনশীল, মাড়ির সমস্যা রয়েছে বা স্কেলিং করা হয়েছে, তাদের জন্য নরম ব্রিসলের ব্রাশ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
টুথব্রাশের আকার কেন গুরুত্বপূর্ণ
অনেকেই শুধু ব্র্যান্ড বা রঙ দেখে ব্রাশ কিনে ফেলেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ব্রাশের মাথার আকারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট মাথার (Small Head) ব্রাশ মুখের ভেতরের প্রতিটি কোণে, বিশেষ করে পেছনের মোলার দাঁতের চারপাশে সহজে পৌঁছাতে পারে। বড় ব্রাশ অনেক সময় শেষের দাঁতগুলো ঠিকভাবে পরিষ্কার করতে পারে না।
ব্রাশের হাতল এমন হওয়া উচিত, যাতে সহজে ধরা যায় এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায়। শিশুদের জন্য অবশ্যই তাদের বয়স অনুযায়ী তৈরি বিশেষ ব্রাশ ব্যবহার করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র দামি ব্রাশই ভালো হবে-এমন ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সঠিক আকারের নরম ব্রিসলের ব্রাশই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট কেন ব্যবহার করার পরামর্শ দেন দন্ত চিকিৎসকেরা
বর্তমানে দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষায় সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে ফ্লুরাইড (Fluoride) নিয়ে। WHO, CDC এবং ADA-এর মতে, ফ্লুরাইড দাঁতের এনামেলকে শক্তিশালী করতে এবং দাঁতের ক্ষয় (Cavity) প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিদিন ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করলে দাঁতের ওপর অ্যাসিডের ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা কমে এবং এনামেলের ক্ষয় ধীর হতে পারে। এই কারণেই বিশ্বের অধিকাংশ দন্তচিকিৎসা সংস্থা ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।
তবে শিশুদের ক্ষেত্রে টুথপেস্টের পরিমাণ বয়স অনুযায়ী নির্ধারণ করা জরুরি। খুব ছোট শিশু যেন অতিরিক্ত টুথপেস্ট গিলে না ফেলে, সে বিষয়েও অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র দাঁত সাদা করার দাবি করা টুথপেস্টের চেয়ে দাঁতের সুরক্ষায় ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দাঁত ব্রাশ করার আদর্শ সময় কখন?
এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে-খাওয়ার আগে নাকি পরে ব্রাশ করা উচিত?
American Dental Association-এর মতে, প্রতিদিন দুইবার দাঁত ব্রাশ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সকালে দিনের শুরুতে এবং রাতে ঘুমানোর আগে।
অনেক বিশেষজ্ঞ নাশতার পর ব্রাশ করার পরামর্শ দেন, তবে যদি খুব অ্যাসিডিক খাবার বা ফলের রস খাওয়া হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ না করে অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করা ভালো। কারণ অ্যাসিডিক খাবারের পর এনামেল কিছুটা নরম অবস্থায় থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করলে ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রাতে ঘুমানোর আগে ব্রাশ করাকে দন্ত চিকিৎসকেরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। কারণ সারারাত মুখে লালার পরিমাণ কমে যায়, ফলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। যদি দাঁতের ফাঁকে খাবার আটকে থাকে, তাহলে এই সময় প্লাক ও অ্যাসিড তৈরি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
কেন শুধু সকালে ব্রাশ করলেই যথেষ্ট নয়
বাংলাদেশে এখনও অনেক মানুষ শুধু সকালে দাঁত ব্রাশ করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, রাতের ব্রাশ বাদ দেওয়া দাঁতের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতির একটি কারণ। সারাদিনের খাবারের কণা, ব্যাকটেরিয়া এবং প্লাক যদি দাঁতের ওপর রাতভর জমে থাকে, তাহলে দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির প্রদাহ, মুখের দুর্গন্ধ এবং ক্যাভিটির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সকালে ব্রাশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাতে ঘুমানোর আগে ব্রাশ করাও সমান বা অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই একটি অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে দাঁতের বহু সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে।
সঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কী? শুধু ব্রাশ করলেই কেন যথেষ্ট নয়
প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করা ভালো অভ্যাস, কিন্তু কীভাবে ব্রাশ করছেন সেটিই আসল বিষয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), American Dental Association (ADA), FDI World Dental Federation এবং National Institute of Dental and Craniofacial Research (NIDCR)-এর মতে, ভুল পদ্ধতিতে দাঁত ব্রাশ করলে দাঁত পুরোপুরি পরিষ্কার হয় না। বরং দীর্ঘদিন একই ভুল অভ্যাস অনুসরণ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষয়, মাড়ি সরে যাওয়া, দাঁতের সংবেদনশীলতা এবং মুখগহ্বরের অন্যান্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।
দন্ত চিকিৎসকদের মতে, ব্রাশ করার উদ্দেশ্য দাঁতকে জোরে ঘষে চকচকে করা নয়; বরং দাঁতের গায়ে ও মাড়ির সংযোগস্থলে জমে থাকা প্লাক অপসারণ করা। কারণ বেশিরভাগ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এই অংশেই জমা হয়। তাই সঠিক কোণ, সঠিক চাপ এবং সঠিক গতিতে ব্রাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকেই ব্রাশ হাতে নিয়েই ডান-বাম দিকে দ্রুত ঘষতে থাকেন। এতে দাঁতের সামনের অংশ কিছুটা পরিষ্কার হলেও দাঁতের ফাঁক, মাড়ির কিনারা এবং পেছনের দাঁতগুলো ঠিকভাবে পরিষ্কার হয় না। ফলে প্লাক জমে থেকেই যায় এবং ধীরে ধীরে টারটারে পরিণত হয়।
সঠিক পদ্ধতিতে ব্রাশ করলে শুধু দাঁত নয়, মাড়িও সুস্থ থাকে। তাই প্রতিদিন মাত্র দুই মিনিট সময় দিলেও যদি বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ করা যায়, তাহলে দাঁতের অধিকাংশ সাধারণ সমস্যা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
৪৫ ডিগ্রি কোণে ব্রাশ ধরার পরামর্শ কেন দেন দন্ত চিকিৎসকেরা
দাঁত ব্রাশ করার সময় ব্রাশটি দাঁতের ওপর সোজা করে না ধরে দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে ধরে ব্রাশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি কেবল একটি প্রচলিত নিয়ম নয়; বরং বহু গবেষণায় কার্যকর প্রমাণিত একটি পদ্ধতি।
American Dental Association-এর মতে, প্লাক সবচেয়ে বেশি জমে দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে। যদি ব্রাশ সোজা করে ধরা হয়, তাহলে ব্রিসল অনেক সময় সেই অংশে ঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু ৪৫ ডিগ্রি কোণে ব্রাশ ধরলে ব্রিসল মাড়ির কিনারা এবং দাঁতের মাঝামাঝি অংশে সহজে প্রবেশ করে এবং জমে থাকা প্লাক সরাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কোণে ব্রাশ করলে মাড়ির ক্ষতির ঝুঁকিও কম থাকে। একই সঙ্গে দাঁতের এনামেলের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপও পড়ে না।
চিকিৎসকদের ভাষায়, দাঁত ব্রাশ করা একটি প্রযুক্তিগত দক্ষতা। শুধু সময় দিলেই হবে না; সঠিক কোণ ব্যবহার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
Bass Technique কী এবং কেন এটিকে সবচেয়ে কার্যকর ব্রাশিং পদ্ধতি বলা হয়
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দন্ত চিকিৎসক যে ব্রাশিং কৌশলটি সবচেয়ে বেশি সুপারিশ করেন, সেটি হলো Modified Bass Technique।
এই পদ্ধতিতে প্রথমে ব্রাশটি দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে রাখা হয়। এরপর খুব ছোট ছোট বৃত্তাকার বা কম্পনধর্মী (vibratory) নড়াচড়া করে প্লাক আলগা করা হয়। তারপর ব্রাশটি দাঁতের ওপর থেকে নিচে অথবা নিচ থেকে ওপরে আলতোভাবে সরিয়ে পরিষ্কার করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে দাঁতের কিনারা এবং মাড়ির সংযোগস্থল সবচেয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার হয়। পাশাপাশি মাড়িতে অপ্রয়োজনীয় চাপও পড়ে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ছোট নিয়ন্ত্রিত মুভমেন্টই সবচেয়ে কার্যকর। বড় বড় জোরালো স্ট্রোক দিয়ে দাঁত ঘষলে দাঁত দ্রুত পরিষ্কার হয়-এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
দুই মিনিট ধরে ব্রাশ করার পরামর্শ কেন দেওয়া হয়
অনেকেই মাত্র ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড ব্রাশ করেই শেষ করে দেন। আবার কেউ পাঁচ মিনিট ধরে দাঁত ঘষতে থাকেন। এই দুটি অভ্যাসই সঠিক নয়।
American Dental Association এবং Oral Health Foundation-এর মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিবার অন্তত দুই মিনিট ধরে দাঁত ব্রাশ করা উচিত। এই সময়ের মধ্যে মুখকে চারটি ভাগে ভাগ করে প্রতিটি অংশে প্রায় ৩০ সেকেন্ড সময় দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।
দন্ত চিকিৎসকদের মতে, কম সময় ব্রাশ করলে দাঁতের সব অংশ পরিষ্কার হয় না। আবার প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় এবং অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ব্রাশ করলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে পারে।
বর্তমানে অনেক ইলেকট্রিক টুথব্রাশে দুই মিনিটের টাইমার থাকে। সাধারণ ব্রাশ ব্যবহারকারীরাও মোবাইলের টাইমার ব্যবহার করে সহজেই এই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
দাঁতের সব অংশ কি সমানভাবে পরিষ্কার করা হয়?
অনেকেই শুধু সামনের দাঁতগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করেন, কারণ আয়নায় এগুলোই বেশি দেখা যায়। কিন্তু মুখের ভেতরে আরও অনেক অংশ রয়েছে, যেগুলো পরিষ্কার না করলে দাঁতের রোগের ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁতের বাইরের অংশ, ভেতরের অংশ এবং চিবানোর অংশ-সব জায়গাই সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। বিশেষ করে পেছনের মোলার দাঁতের ওপরের খাঁজে খাবারের কণা বেশি আটকে থাকে এবং এখান থেকেই অনেক সময় ক্যাভিটি শুরু হয়।
সামনের নিচের দাঁতের ভেতরের অংশেও লালার গ্রন্থি থাকার কারণে দ্রুত টারটার জমে। তাই এই অংশ পরিষ্কার করাও অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, ব্রাশ করার সময় প্রতিটি দাঁত এবং প্রতিটি পৃষ্ঠ পরিষ্কার হচ্ছে কি না, সেদিকে সচেতন থাকতে হবে।
জিহ্বা পরিষ্কার না করলে কী সমস্যা হতে পারে
দাঁত পরিষ্কার করলেও অনেকেই জিহ্বা পরিষ্কার করেন না। অথচ মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়ার একটি বড় অংশ জিহ্বার ওপরও জমা থাকে। Mayo Clinic এবং Oral Health Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, জিহ্বার ওপর জমে থাকা ব্যাকটেরিয়া মুখে দুর্গন্ধ (Halitosis)-এর অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। এছাড়া খাবারের স্বাদ অনুভবের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ব্রাশ করার সময় জিহ্বাও আলতোভাবে পরিষ্কার করা উচিত। এজন্য টুথব্রাশের পেছনের টাং ক্লিনার বা আলাদা টাং স্ক্র্যাপার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে জিহ্বা খুব জোরে ঘষা উচিত নয়। এতে জিহ্বার সংবেদনশীল টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শুধু ব্রাশ কি যথেষ্ট, নাকি ডেন্টাল ফ্লসও প্রয়োজন?
চিকিৎসকদের মতে, শুধু টুথব্রাশ দিয়ে দাঁতের সব অংশ পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। কারণ ব্রাশের ব্রিসল দাঁতের খুব সরু ফাঁকের ভেতরে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে না। American Dental Association-এর মতে, দাঁতের মাঝখানে জমে থাকা প্লাক এবং খাবারের কণা পরিষ্কার করার জন্য ডেন্টাল ফ্লস অত্যন্ত কার্যকর।
ফ্লস ব্যবহার করলে ক্যাভিটি এবং মাড়ির প্রদাহের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিশেষ করে যাদের দাঁতের ফাঁক খুব কম, তাদের জন্য এটি আরও বেশি উপকারী।
তবে চিকিৎসকদের মতে, ভুলভাবে ফ্লস ব্যবহার করলে মাড়িতে আঘাত লাগতে পারে। তাই প্রথমবার ব্যবহার করার আগে দন্ত চিকিৎসকের কাছ থেকে সঠিক পদ্ধতি জেনে নেওয়া ভালো।
ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ কারা ব্যবহার করবেন
সব মানুষের জন্য একই ধরনের পরিষ্কার করার উপকরণ প্রয়োজন হয় না। যাদের দাঁতের ফাঁক তুলনামূলক বড়, ব্রেস রয়েছে, ইমপ্লান্ট রয়েছে অথবা মাড়ি কিছুটা সরে গেছে, তাদের জন্য ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ অনেক সময় সাধারণ ফ্লসের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।
এই ছোট ব্রাশ দাঁতের ফাঁকে সহজে প্রবেশ করে জমে থাকা প্লাক পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
চিকিৎসকদের মতে, নিজের দাঁতের ফাঁকের আকার অনুযায়ী সঠিক মাপের ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার করা জরুরি। ভুল মাপ ব্যবহার করলে মাড়ির ক্ষতি হতে পারে।
মাউথওয়াশ কি সবার ব্যবহার করা উচিত?
অনেকেই মনে করেন, মাউথওয়াশ ব্যবহার করলেই দাঁত ভালো থাকবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটি মূল চিকিৎসা নয়; বরং একটি সহায়ক উপাদান। ফ্লুরাইডযুক্ত বা অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। যেমন-মাড়ির প্রদাহ, ব্রেস ব্যবহারকারী, মুখে অতিরিক্ত ব্যাকটেরিয়া অথবা চিকিৎসকের নির্দিষ্ট পরামর্শ থাকলে।
তবে শুধু মাউথওয়াশ ব্যবহার করে ব্রাশ বা ফ্লসের বিকল্প হিসেবে ভাবা ভুল। মাউথওয়াশ কখনোই দাঁতের গায়ে জমে থাকা প্লাক যান্ত্রিকভাবে পরিষ্কার করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালকোহলযুক্ত মাউথওয়াশ দীর্ঘদিন নিয়মিত ব্যবহার করার প্রয়োজন অধিকাংশ মানুষের নেই। কোন ধরনের মাউথওয়াশ ব্যবহার করবেন, তা দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ইলেকট্রিক টুথব্রাশ নাকি সাধারণ টুথব্রাশ-কোনটি ভালো?
বর্তমানে ইলেকট্রিক টুথব্রাশের ব্যবহার বাড়ছে। Cochrane Oral Health Review এবং American Dental Association-এর তথ্য অনুযায়ী, সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে ইলেকট্রিক টুথব্রাশ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে প্লাক এবং মাড়ির প্রদাহ কিছুটা বেশি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সাধারণ টুথব্রাশ কার্যকর নয়। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করলে সাধারণ সফট-ব্রিসল টুথব্রাশও দাঁত পরিষ্কার রাখতে যথেষ্ট কার্যকর।
ইলেকট্রিক ব্রাশ বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, হাত কাঁপে এমন রোগী, আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি অথবা যাদের ব্রাশ করার কৌশল ঠিকভাবে আয়ত্ত করা কঠিন, তাদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাশটি বৈদ্যুতিক না সাধারণ-এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি সঠিকভাবে এবং নিয়মিত ব্যবহার করা।
কেন দাঁতে ক্যাভিটি হয়, কীভাবে শুরু হয় দাঁতের ক্ষয়
দাঁতের সবচেয়ে পরিচিত সমস্যাগুলোর একটি হলো ক্যাভিটি বা ডেন্টাল ক্যারিজ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোর একটি। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক-সব বয়সের মানুষেরই এই সমস্যা হতে পারে। তবে ভালো খবর হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
National Institute of Dental and Craniofacial Research (NIDCR)-এর তথ্য অনুযায়ী, মুখের ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই শত শত ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। খাবারের পর বিশেষ করে চিনি ও শর্করাজাতীয় খাবার দাঁতের ওপর জমে থাকলে এসব ব্যাকটেরিয়া তা ভেঙে অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড ধীরে ধীরে দাঁতের সবচেয়ে শক্ত স্তর এনামেলকে ক্ষয় করতে শুরু করে। শুরুতে ক্ষতি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনামেলে ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি হয়। এ অবস্থাকেই ক্যাভিটির প্রাথমিক ধাপ বলা হয়।
যদি এই অবস্থায় চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে ক্ষয় ধীরে ধীরে এনামেল ভেদ করে ডেন্টিন এবং পরে দাঁতের স্নায়ু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তখন তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, ফোঁড়া (Dental Abscess) এবং শেষ পর্যন্ত দাঁত হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়।
দন্ত চিকিৎসকদের মতে, অনেকেই দাঁতে ব্যথা না থাকলে ক্যাভিটি হয়েছে বুঝতেই পারেন না। অথচ শুরুতেই নিয়মিত পরীক্ষা করালে ছোট ক্ষয় সহজেই চিকিৎসা করা সম্ভব।
মাড়ির প্রদাহ (Gingivitis) কী, আর Periodontitis কেন এত বিপজ্জনক
অনেক মানুষ মনে করেন দাঁতের সমস্যার মানেই শুধু ক্যাভিটি। কিন্তু বাস্তবে মাড়ির রোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। FDI World Dental Federation এবং American Academy of Periodontology-এর মতে, অধিকাংশ মাড়ির রোগের শুরু হয় জিনজিভাইটিস (Gingivitis) দিয়ে।
জিনজিভাইটিসে মাড়ি লাল হয়ে যায়, ফুলে যায় এবং ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়ে। এই পর্যায়ে দাঁতের হাড় বা গভীর টিস্যুর ক্ষতি সাধারণত হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা করলে রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কিন্তু চিকিৎসা না করলে জিনজিভাইটিস ধীরে ধীরে পেরিওডোন্টাইটিস (Periodontitis)-এ পরিণত হতে পারে। তখন সংক্রমণ শুধু মাড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে না; দাঁতকে ধরে রাখা হাড় এবং লিগামেন্টও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পেরিওডোন্টাইটিস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দাঁত নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে এবং একসময় দাঁত পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশ্বব্যাপী বয়স্কদের দাঁত হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ এই রোগ।
ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়া কি স্বাভাবিক?
বাংলাদেশে অনেকেই মনে করেন ব্রাশ করার সময় অল্প রক্ত পড়া স্বাভাবিক বিষয়। কেউ কেউ আবার রক্ত পড়লে কয়েকদিন ব্রাশই বন্ধ করে দেন। দুটি ধারণাই ভুল। American Dental Association-এর মতে, সুস্থ মাড়ি থেকে সাধারণত ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়া উচিত নয়। যদি নিয়মিত রক্ত পড়ে, তাহলে সেটি মাড়ির প্রদাহ, প্লাক জমে থাকা অথবা অন্য কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
অনেকেই রক্ত পড়ার ভয়ে সেই জায়গায় ব্রাশ করা বন্ধ করে দেন। এতে সেখানে আরও বেশি প্লাক জমে এবং প্রদাহ আরও বাড়তে থাকে।
দন্ত চিকিৎসকদের মতে, যদি কয়েকদিন ধরে নিয়মিত রক্ত পড়ে, মাড়ি ফুলে থাকে, মুখে দুর্গন্ধ থাকে বা দাঁত নড়তে শুরু করে, তাহলে দেরি না করে দন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
মুখে দুর্গন্ধ কেন হয়, শুধু দাঁত নোংরা থাকাই কি একমাত্র কারণ?
মুখে দুর্গন্ধ বা Halitosis এমন একটি সমস্যা, যা অনেক সময় মানুষের আত্মবিশ্বাসও কমিয়ে দেয়। Oral Health Foundation এবং Mayo Clinic-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে মুখে দুর্গন্ধের উৎস মুখগহ্বরের ভেতরেই থাকে।
দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাবারের কণা, প্লাক, মাড়ির রোগ, জিহ্বার ওপর জমে থাকা ব্যাকটেরিয়া এবং দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করা দাঁত-এসবই মুখে দুর্গন্ধের প্রধান কারণ।
তবে শুধু মুখের সমস্যাই নয়, কিছু ক্ষেত্রে মুখ শুকিয়ে যাওয়া (Dry Mouth), সাইনাসের সংক্রমণ, টনসিলের সমস্যা, ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের কিছু রোগ এবং পরিপাকতন্ত্রের নির্দিষ্ট সমস্যার কারণেও মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু সুগন্ধিযুক্ত মাউথওয়াশ ব্যবহার করে দুর্গন্ধ ঢেকে রাখলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং এর মূল কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা করা প্রয়োজন।
দাঁত ঠান্ডা বা গরমে শিরশির করলে কেন হয়?
অনেকেই ঠান্ডা পানি, আইসক্রিম, গরম চা বা মিষ্টি খাবার খাওয়ার সময় দাঁতে তীব্র শিরশির অনুভব করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে Dentinal Hypersensitivity বলা হয়। দাঁতের বাইরের এনামেল ক্ষয় হয়ে গেলে অথবা মাড়ি সরে গিয়ে দাঁতের শিকড় উন্মুক্ত হলে দাঁতের ভেতরের ডেন্টিন অংশ বাইরের পরিবেশের সংস্পর্শে চলে আসে। তখন ঠান্ডা, গরম, টক বা মিষ্টি খাবার সহজেই স্নায়ুতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
অতিরিক্ত জোরে ব্রাশ করা, অ্যাসিডিক খাবার বেশি খাওয়া, দাঁত ঘষার অভ্যাস (Bruxism), মাড়ির রোগ অথবা দাঁতের ক্ষয়ের কারণেও এই সমস্যা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবেদনশীল দাঁতের জন্য বিশেষ টুথপেস্ট কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হলেও সমস্যার কারণ নির্ণয় করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় এটি ক্যাভিটি বা মাড়ির রোগেরও লক্ষণ হতে পারে।
অতিরিক্ত জোরে বা বারবার ব্রাশ করার ক্ষতি কতটা?
অনেকের ধারণা, দিনে তিন-চারবার জোরে জোরে ব্রাশ করলে দাঁত আরও পরিষ্কার থাকবে। কিন্তু American Dental Association-এর মতে, অতিরিক্ত ব্রাশ করা বা অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা দাঁতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ব্রাশ করলে দাঁতের এনামেল ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে। একই সঙ্গে মাড়ি নিচের দিকে সরে গিয়ে দাঁতের শিকড় উন্মুক্ত হতে পারে। ফলে দাঁত সংবেদনশীল হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে দুইবার, প্রতিবার প্রায় দুই মিনিট ধরে, নরম ব্রিসলের ব্রাশ দিয়ে আলতোভাবে ব্রাশ করাই যথেষ্ট। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্রাশ করার কোনো বৈজ্ঞানিক উপকারিতা নেই।
দাঁত সাদা করার নামে যে ভুলগুলো অনেকেই করছেন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাঁত সাদা করার নানা ঘরোয়া উপায় প্রায়ই দেখা যায়। কেউ লেবু দিয়ে দাঁত ঘষেন, কেউ বেকিং সোডা, লবণ, কয়লার গুঁড়া বা বিভিন্ন ঘরোয়া মিশ্রণ ব্যবহার করেন।
Harvard School of Dental Medicine এবং American Dental Association-এর মতে, এসব পদ্ধতির অনেকগুলোরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অতিরিক্ত ঘষামাজা বা অ্যাসিডিক উপাদান ব্যবহারে দাঁতের এনামেল স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে লেবুর রসের মতো অ্যাসিডিক উপাদান নিয়মিত দাঁতে ব্যবহার করলে এনামেল দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। আবার অতিরিক্ত ঘর্ষণকারী উপাদান দাঁতের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দাঁত সাদা করার প্রয়োজন হয়, তাহলে অবশ্যই দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।
স্কেলিং কি দাঁতের ক্ষতি করে? প্রচলিত ভুল ধারণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো-স্কেলিং করলে দাঁত নষ্ট হয়ে যায় বা দাঁতের ফাঁক বেড়ে যায়। American Dental Association, NHS এবং FDI World Dental Federation-এর মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
স্কেলিংয়ের সময় দাঁতের ওপর জমে থাকা শক্ত টারটার ও ক্যালকুলাস অপসারণ করা হয়। এগুলো অনেক সময় এত বেশি জমে থাকে যে রোগী মনে করেন এগুলোই দাঁতের অংশ। যখন স্কেলিংয়ের মাধ্যমে এগুলো সরিয়ে ফেলা হয়, তখন আগের লুকিয়ে থাকা দাঁতের ফাঁক দৃশ্যমান হতে পারে। এতে অনেকেই ভুল করে ভাবেন স্কেলিংয়ের কারণে ফাঁক তৈরি হয়েছে।
আবার দীর্ঘদিন টারটার জমে থাকার কারণে মাড়ি ফুলে থাকে। স্কেলিংয়ের পর প্রদাহ কমে গেলে মাড়ি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তখনও দাঁত কিছুটা আলাদা মনে হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, স্কেলিং দাঁতের ক্ষতি করে না; বরং মাড়ির রোগ প্রতিরোধ এবং দাঁত দীর্ঘদিন সুস্থ রাখার জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা।
চুইংগাম কি দাঁত পরিষ্কার করে?
অনেকেই মনে করেন খাবারের পর চুইংগাম চিবোলেই দাঁত পরিষ্কার হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। চিনি ছাড়া (Sugar-free) চুইংগাম চিবোলে লালার পরিমাণ কিছুটা বাড়তে পারে, যা মুখের অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করে। তবে এটি কখনোই ব্রাশ বা ফ্লসের বিকল্প নয়।
চিকিৎসকদের মতে, চুইংগাম প্লাক বা টারটার অপসারণ করতে পারে না। তাই এটিকে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু নিয়মিত দাঁত পরিষ্কারের বিকল্প হিসেবে নয়।
টুথব্রাশ কতদিন ব্যবহার করবেন, কখন পরিবর্তন করা জরুরি
অনেকেই একটি টুথব্রাশ ছয় মাস বা তারও বেশি সময় ব্যবহার করেন। বাইরে থেকে ব্রাশ মোটামুটি ঠিকঠাক দেখালেও এর পরিষ্কার করার ক্ষমতা অনেকটাই কমে যেতে পারে। American Dental Association (ADA), Centers for Disease Control and Prevention (CDC) এবং Oral Health Foundation-এর মতে, সাধারণভাবে একটি টুথব্রাশ প্রতি তিন থেকে চার মাস পর পরিবর্তন করা উচিত। তবে ব্রিসল যদি এর আগেই বাঁকা, ছড়িয়ে যায় বা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়ে, তাহলে আরও আগে নতুন ব্রাশ ব্যবহার করা উচিত।
চিকিৎসকদের মতে, টুথব্রাশের ব্রিসল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নমনীয়তা হারায়। তখন এটি দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে জমে থাকা প্লাক কার্যকরভাবে পরিষ্কার করতে পারে না। অনেকেই মনে করেন ব্রাশটি এখনও ব্যবহারযোগ্য, কারণ এটি ভাঙেনি। কিন্তু বাস্তবে ক্ষয়প্রাপ্ত ব্রিসল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
শিশুদের ক্ষেত্রে ব্রাশ আরও দ্রুত নষ্ট হতে পারে। কারণ তারা অনেক সময় অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ব্রাশ করে বা ব্রাশ চিবানোর অভ্যাস থাকে। তাই অভিভাবকদের নিয়মিত ব্রাশের অবস্থা পরীক্ষা করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্রাশ ব্যবহার করা কোনো বিলাসিতা নয়; বরং দাঁতের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য রক্ষার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
টুথব্রাশ কীভাবে সংরক্ষণ করবেন, কোথায় রাখবেন
ব্রাশ কেনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। অনেকেই ব্রাশ ব্যবহারের পর ভেজা অবস্থায় বন্ধ কেসের ভেতরে রেখে দেন অথবা বাথরুমের বেসিনের পাশে খোলা অবস্থায় দীর্ঘদিন রেখে দেন।
CDC এবং American Dental Association-এর মতে, ব্যবহারের পর ব্রাশ পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে অতিরিক্ত পানি ঝেড়ে খোলা অবস্থায় সোজা করে এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে বাতাস চলাচল করে এবং ব্রাশটি স্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় থাকলে বিভিন্ন অণুজীব বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, একটি ব্রাশ যেন অন্য ব্রাশের ব্রিসলের সঙ্গে লেগে না থাকে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এতে এক ব্রাশ থেকে অন্য ব্রাশে জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি কিছুটা কমে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টয়লেটের খুব কাছাকাছি খোলা অবস্থায় ব্রাশ রাখা ঠিক নয়। টয়লেট ফ্লাশ করার সময় বাতাসে ক্ষুদ্র পানিকণা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা আশপাশের জিনিসের ওপর গিয়ে বসতে পারে। তাই সম্ভব হলে ব্রাশ এমন স্থানে রাখা উচিত, যা টয়লেট থেকে কিছুটা দূরে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
ভাইরাল বা সংক্রামক রোগের পর টুথব্রাশ পরিবর্তন করা কি সত্যিই প্রয়োজন?
অনেকেই জ্বর, ফ্লু, গলা ব্যথা বা ভাইরাল সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরও আগের টুথব্রাশ ব্যবহার করেন। এ নিয়ে নানা মত থাকলেও অনেক দন্ত চিকিৎসক সতর্কতার অংশ হিসেবে অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার পর টুথব্রাশ পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার পুনঃসংক্রমণের ঝুঁকি খুব বেশি না হলেও, সংক্রামক অসুস্থতার সময় ব্যবহৃত ব্রাশ দীর্ঘদিন ব্যবহার না করে নতুন ব্রাশ নেওয়া একটি ভালো স্বাস্থ্যবিধি। বিশেষ করে স্ট্রেপ থ্রোটের মতো কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের পর অনেক চিকিৎসক নতুন ব্রাশ ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
তবে শুধু অসুস্থতার কারণেই নয়, যদি ব্রাশের ব্রিসল নষ্ট হয়ে যায় বা দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হয়, সেক্ষেত্রেও পরিবর্তন করা উচিত।
চিকিৎসকদের মতে, একটি নতুন টুথব্রাশের দাম ভবিষ্যতের দাঁতের চিকিৎসার তুলনায় অনেক কম। তাই এ ক্ষেত্রে অযথা দেরি না করাই ভালো।
ধূমপান, পান-সুপারি ও জর্দা কীভাবে দাঁত ও মাড়ির ক্ষতি করে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং FDI World Dental Federation দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য শুধু ফুসফুসের জন্য নয়, মুখগহ্বরের জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর।
ধূমপানের কারণে দাঁতে দাগ পড়ে, মুখ শুকিয়ে যায়, লালার স্বাভাবিক সুরক্ষামূলক ভূমিকা কমে যায় এবং মাড়িতে রক্ত চলাচল হ্রাস পায়। ফলে মাড়ির রোগ হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে স্কেলিং বা অস্ত্রোপচারের পর ক্ষত সারতেও বেশি সময় লাগে।
অন্যদিকে পান, সুপারি, জর্দা, গুল ও অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে দাঁতের দাগ, মাড়ির ক্ষতি, দাঁতের ক্ষয় এবং মুখগহ্বরের ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখগহ্বরের ক্যানসারের অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ হলো তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার। তাই দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণভাবে বর্জন করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
চিনি, কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংক দাঁতের কতটা ক্ষতি করে
অনেকেই শুধু চকলেট বা মিষ্টিকে দাঁতের ক্ষতির জন্য দায়ী মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, শুধু কতটা চিনি খাচ্ছেন তা নয়, কতবার চিনি খাচ্ছেন সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বারবার মিষ্টিজাতীয় খাবার, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, প্যাকেটজাত ফলের রস বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় পান করলে মুখের ব্যাকটেরিয়া বারবার অ্যাসিড তৈরি করে। প্রতিবার অ্যাসিড তৈরি হওয়ার পর প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত দাঁতের এনামেল আক্রমণের মুখে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কোমল পানীয়তে শুধু চিনি নয়, ফসফরিক অ্যাসিড ও সাইট্রিক অ্যাসিডও থাকে, যা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে। তাই এসব পানীয় ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় ধরে পান করার পরিবর্তে যতটা সম্ভব সীমিত রাখা উচিত।
যদি এমন পানীয় পান করতেই হয়, তাহলে পরে সাধারণ পানি দিয়ে মুখ কুলি করা ভালো। তবে সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ না করে অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন দন্ত চিকিৎসকেরা।
শিশুদের দাঁতের যত্ন কখন থেকে শুরু করা উচিত
অনেক অভিভাবক মনে করেন দুধদাঁত যেহেতু একসময় পড়ে যাবে, তাই এগুলোর যত্ন নেওয়া ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু American Academy of Pediatric Dentistry (AAPD) এবং ADA-এর মতে, এই ধারণা ভুল। শিশুর প্রথম দাঁত ওঠার পর থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস শুরু করা উচিত। প্রথমদিকে নরম ভেজা কাপড় বা শিশুর জন্য নির্ধারিত নরম ব্রাশ ব্যবহার করা যেতে পারে।
দুধদাঁত ঠিকভাবে না থাকলে শিশুর চিবানো, কথা বলা এবং পরবর্তী স্থায়ী দাঁতের অবস্থানও প্রভাবিত হতে পারে। পাশাপাশি দুধদাঁতে সংক্রমণ হলে সেটি স্থায়ী দাঁতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে ছোটবেলা থেকেই দিনে দুইবার দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস শেখানো উচিত এবং অতিরিক্ত মিষ্টি, চকলেট ও চিনিযুক্ত পানীয় সীমিত রাখতে হবে।
গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন কেন আরও গুরুত্বপূর্ণ
গর্ভাবস্থায় হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে অনেক নারীর মাড়ি বেশি সংবেদনশীল হয়ে যায়। American College of Obstetricians and Gynecologists (ACOG) এবং ADA-এর মতে, এই সময় Pregnancy Gingivitis হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
অনেকের মাড়ি ফুলে যায়, ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়ে বা প্রদাহ দেখা দেয়। তাই এই সময় দাঁতের যত্ন আরও গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থায় নিরাপদভাবে দাঁতের পরীক্ষা, স্কেলিং এবং প্রয়োজনীয় অনেক চিকিৎসাই করা যায়। তাই শুধু গর্ভবতী হওয়ার কারণে দাঁতের চিকিৎসা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থায় মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য ভালো রাখা মা ও শিশুর উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস রোগীদের দাঁতের যত্নে কেন বাড়তি সতর্কতা দরকার
ডায়াবেটিস এবং মাড়ির রোগের মধ্যে দ্বিমুখী সম্পর্ক রয়েছে। International Diabetes Federation (IDF) এবং American Diabetes Association-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিস থাকলে মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
আবার গুরুতর মাড়ির প্রদাহ থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার রাখা, ব্রাশ ও ফ্লস ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিস রোগীদের মুখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যাও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এতে ক্যাভিটির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বছরে কতবার দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত
অনেকেই দাঁতে তীব্র ব্যথা না হওয়া পর্যন্ত দন্ত চিকিৎসকের কাছে যান না। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি বড় ভুল। American Dental Association-এর মতে, কার কত ঘন ঘন ডেন্টিস্ট দেখানো দরকার, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য বছরে অন্তত এক থেকে দুইবার দাঁতের পরীক্ষা করানো উপকারী।
যাদের মাড়ির রোগ, ডায়াবেটিস, ধূমপানের অভ্যাস, ব্রেস বা ইমপ্লান্ট রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক আরও ঘন ঘন ফলোআপের পরামর্শ দিতে পারেন।
নিয়মিত পরীক্ষা করালে ক্যাভিটি, মাড়ির রোগ, মুখের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ এবং অন্যান্য সমস্যা শুরুতেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এতে চিকিৎসাও সহজ এবং কম ব্যয়বহুল হয়।
দাঁতের যত্ন নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা, কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
দাঁতের যত্ন নিয়ে সমাজে বহু বছর ধরে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, দাঁতে ব্যথা না থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার কেউ মনে করেন স্কেলিং করলে দাঁত নষ্ট হয়ে যায়। World Health Organization (WHO), American Dental Association (ADA), FDI World Dental Federation এবং Oral Health Foundation-এর মতে, এসব ভুল ধারণার কারণেই অনেক মানুষ সময়মতো চিকিৎসা না নিয়ে জটিল সমস্যায় পড়েন।
সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, দাঁত থেকে রক্ত পড়লে ব্রাশ করা বন্ধ করে দিতে হবে। বাস্তবে এর উল্টোটা সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রক্ত পড়া মাড়ির প্রদাহের লক্ষণ। সঠিকভাবে ব্রাশ ও ফ্লস ব্যবহার করলে এবং প্রয়োজনে স্কেলিং করালে এই সমস্যা কমতে পারে। ব্রাশ বন্ধ করে দিলে প্লাক আরও বেশি জমে প্রদাহ বাড়ে।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো, বয়স বাড়লে দাঁত পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ দাঁত ও মাড়ি থাকলে অনেক মানুষ সারা জীবন নিজের স্বাভাবিক দাঁত ব্যবহার করতে পারেন। দাঁত পড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ বয়স নয়; বরং দীর্ঘদিনের মাড়ির রোগ, অবহেলা এবং যথাযথ চিকিৎসার অভাব।
লবণ, কয়লার গুঁড়া, লেবু বা বেকিং সোডা দিয়ে দাঁত মাজা কি নিরাপদ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাকৃতিক উপায়ে দাঁত সাদা করার নানা পরামর্শ দেখা যায়। অনেকেই লবণ, কয়লার গুঁড়া, বেকিং সোডা, লেবুর রস কিংবা বিভিন্ন ঘরোয়া মিশ্রণ ব্যবহার করেন। কিন্তু Harvard School of Dental Medicine, ADA এবং NHS-এর তথ্য অনুযায়ী, এসব পদ্ধতির বেশিরভাগই নিয়মিত ব্যবহারের জন্য নিরাপদ নয়।
বিশেষ করে লেবুর রসের মতো অ্যাসিডিক উপাদান দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে। এনামেল একবার ক্ষয় হয়ে গেলে তা আর স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসে না। অন্যদিকে কয়লার গুঁড়া বা অতিরিক্ত ঘর্ষণকারী উপাদান দাঁতের ওপরের সুরক্ষামূলক স্তর ধীরে ধীরে পাতলা করে দিতে পারে।
বেকিং সোডা কিছু নির্দিষ্ট টুথপেস্টে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ব্যবহার করা হলেও ঘরোয়া উপায়ে প্রতিদিন এটি দিয়ে দাঁত ঘষা নিরাপদ নয়। একইভাবে লবণ দিয়ে জোরে দাঁত মাজলে মাড়ির ক্ষতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁত পরিষ্কার ও সাদা রাখার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে নিয়মিত ব্রাশ করা এবং প্রয়োজনে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে পেশাদার দাঁত পরিষ্কার বা হোয়াইটেনিং করানো।
দাঁত উঠিয়ে ফেলাই কি সবসময় একমাত্র সমাধান?
বাংলাদেশে এখনও অনেক মানুষ দাঁতে ব্যথা শুরু হলেই দাঁত তুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তাদের ধারণা, একবার ব্যথা শুরু হলে দাঁত আর বাঁচানো সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক দন্তচিকিৎসা এই ধারণাকে সমর্থন করে না।
চিকিৎসকদের মতে, যদি দাঁতের শিকড় এবং আশপাশের হাড় ভালো অবস্থায় থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই রুট ক্যানাল চিকিৎসা (Root Canal Treatment) করে দাঁত সংরক্ষণ করা সম্ভব। এই চিকিৎসায় সংক্রমিত স্নায়ু ও টিস্যু পরিষ্কার করে দাঁতকে পুনরায় কার্যকর করা হয়।
American Association of Endodontists-এর মতে, নিজের প্রাকৃতিক দাঁতের বিকল্প এখনো পুরোপুরি কিছুই নয়। তাই সম্ভব হলে দাঁত সংরক্ষণ করাই চিকিৎসকদের প্রথম লক্ষ্য।
তবে যদি দাঁত এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে তা আর সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়, অথবা গুরুতর সংক্রমণ, ভাঙন বা অন্য জটিলতা থাকে, তখন দাঁত তুলে ফেলা প্রয়োজন হতে পারে। কোন ক্ষেত্রে কোন চিকিৎসা হবে, তা শুধুমাত্র দন্ত চিকিৎসক পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য ও হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিসের সম্পর্ক কতটা?
গত দুই দশকে মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য এবং শরীরের অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। WHO, CDC এবং American Academy of Periodontology-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের মাড়ির রোগ এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
মাড়িতে দীর্ঘদিন প্রদাহ থাকলে সেখানকার ব্যাকটেরিয়া ও প্রদাহজনিত রাসায়নিক উপাদান রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি হৃদ্রোগের কিছু ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। যদিও সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনও সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়, তবুও বিশেষজ্ঞরা মুখগহ্বরের স্বাস্থ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট। নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিস মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, আবার গুরুতর মাড়ির রোগ থাকলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখা শুধু দাঁতের জন্য নয়; বরং পুরো শরীরের সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
মুখের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কেন অবহেলা করা উচিত নয়
মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মুখের ক্যানসারের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, তামাক, ধূমপান, জর্দা, গুল, অতিরিক্ত অ্যালকোহল এবং কিছু ক্ষেত্রে HPV সংক্রমণ মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের ভেতরে কোনো ঘা যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে না শুকায়, মুখে বা জিহ্বায় সাদা বা লাল দাগ দেখা যায়, অকারণে রক্ত পড়ে, গিলতে সমস্যা হয় বা মুখে অস্বাভাবিক গাঁট অনুভূত হয়, তাহলে দ্রুত দন্ত চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপের সময় অনেক ক্ষেত্রেই মুখের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ ধরা পড়ে, যা দ্রুত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করে।
খাদ্যাভ্যাস কীভাবে দাঁতের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে
দাঁতের স্বাস্থ্য শুধু ব্রাশের ওপর নির্ভর করে না; প্রতিদিন কী খাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সারাদিন বারবার মিষ্টি, বিস্কুট, চকলেট, কেক, কোমল পানীয় বা চিনিযুক্ত খাবার খেলে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অন্যদিকে আঁশযুক্ত ফল, শাকসবজি, পর্যাপ্ত পানি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, বাদাম এবং সুষম খাদ্য দাঁতের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক। চিবিয়ে খেতে হয় এমন খাবার লালা নিঃসরণ বাড়ায়, যা মুখের অ্যাসিড নিরপেক্ষ করতে সাহায্য করে।
চিকিৎসকদের মতে, শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কতবার খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সারাদিন অল্প অল্প করে মিষ্টি খাবার খাওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়া দাঁতের জন্য তুলনামূলক ভালো।
দাঁতের যত্নে বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত পরামর্শ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), American Dental Association (ADA), CDC, FDI World Dental Federation, NHS এবং Oral Health Foundation-এর সুপারিশগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে আসে।
প্রতিদিন অন্তত দুইবার ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দুই মিনিট ধরে নরম ব্রিসলের ব্রাশ ব্যবহার করে দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। ব্রাশ করার সময় মাড়ির সংযোগস্থলও পরিষ্কার করতে হবে এবং প্রতিদিন জিহ্বা পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শুধু ব্রাশ নয়, দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা প্লাক পরিষ্কার করতে ডেন্টাল ফ্লস বা প্রয়োজন অনুযায়ী ইন্টারডেন্টাল ব্রাশ ব্যবহার করা উচিত।
চিনি ও কোমল পানীয় সীমিত রাখা, ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য বর্জন করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং বছরে অন্তত এক থেকে দুইবার দন্ত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে দাঁত পরীক্ষা করানো দীর্ঘমেয়াদে দাঁতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, দাঁতের ব্যথা শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে নিয়মিত পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
দাঁত শুধু খাবার চিবানোর অঙ্গ নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি সুস্থ মুখগহ্বর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সঠিকভাবে খাবার গ্রহণে সহায়তা করে, পরিষ্কারভাবে কথা বলতে সাহায্য করে এবং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতাও বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্লাক, টারটার, ক্যাভিটি কিংবা মাড়ির প্রদাহের মতো সমস্যাগুলো সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ভুল ব্রাশিং পদ্ধতি, অপর্যাপ্ত পরিচর্যা, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, ধূমপান এবং নিয়মিত দন্ত পরীক্ষা না করার ফলেই এসব জটিলতা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, দাঁতের অধিকাংশ রোগই প্রতিরোধযোগ্য। প্রতিদিন দুইবার সঠিক নিয়মে ব্রাশ করা, ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার, নিয়মিত ফ্লস করা, জিহ্বা পরিষ্কার রাখা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ, পর্যাপ্ত পানি পান, তামাকজাত পণ্য পরিহার এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মাধ্যমে অধিকাংশ মুখগহ্বরের সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁতের যত্ন কোনো একদিনের কাজ নয়; এটি সারাজীবনের অভ্যাস। আজকের সঠিক পরিচর্যাই ভবিষ্যতে ব্যয়বহুল চিকিৎসা, দাঁত হারানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। তাই সুন্দর হাসির জন্য নয়, সুস্থ জীবনের জন্যও দাঁতের সঠিক যত্নকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করা জরুরি।