সমন্বয়ের অভাবে চাকসুতে নেতৃত্ব সংকট, মুখোমুখি জিএস ও এজিএস

সমন্বয়ের অভাবে চাকসুতে নেতৃত্ব সংকট, মুখোমুখি জিএস ও এজিএস
  • Author, চবি প্রতিনিধি
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) এর মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে এসেছে। বিবৃতি প্রদান, অফিস কক্ষ বরাদ্দ এবং কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাবকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলে ৩৬ বছর পর নির্বাচিত চাকসুর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, দ্বন্দ্বের শুরু হয় চাকসু থেকে প্রকাশিত একাধিক বিবৃতি নিয়ে। এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিকের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় চাকসুর পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হলেও তাঁকে সে বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি “পতিত শক্তির ষড়যন্ত্রে বিপন্ন দেশ: উত্তরণের পথ জাতীয় ঐক্য” শিরোনামে চাকসুর প্যাড ব্যাবহার করে একটি ফেসবুক পোস্ট ও বিবৃতি দেন। এতে করে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

এ বিষয়ে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক সাইদ বিন হাবিব বলেন, এজিএস চাকসুর প্যাড ব্যবহার করে কোনো ধরনের বিবৃতি দিতে পারেন না। পদাধিকার বলে কেবল সাধারণ সম্পাদকই চাকসুর পক্ষে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে পারেন। তিনি বলেন, এজিএসের সঙ্গে তাঁর প্রথম মতবিরোধ হয় চাকসুর একটি বিবৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে কেন্দ্র করে।

চাকসুর পক্ষ থেকে প্রথম বিবৃতি দেওয়া হয় ৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে “জুলাই সনদের আইনি স্বীকৃতি দিয়ে অবিলম্বে গণভোটের আয়োজন করে রাষ্ট্রসংস্কারের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী কাঠামো বিলুপ্তির আহ্বান চাকসু’র” শিরোনামে। ওই বিবৃতির আগে সন্ধ্যায় অনলাইনে চাকসুর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। জুলাই সনদের আইনি স্বীকৃতি, পিএসসি, দুদক, ন্যায়পাল, বিচার বিভাগ ও মহা হিসাব নিরীক্ষকসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে। অধিকাংশ প্রতিনিধি বিবৃতির পক্ষে মত দিলেও এজিএস এতে আপত্তি জানান এবং চাকসু থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন।

এর পাশাপাশি সম্প্রতি চাকসু কার্যালয়ের রুম বরাদ্দ নিয়েও জিএস ও এজিএসের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। এজিএস অভিযোগ করেন, তাঁকে না জানিয়ে জিএস তাঁর বসার স্থান পরিবর্তন করেছেন। অন্যদিকে জিএস সাইদ বিন হাবিব তাঁর ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন, পূর্ববর্তী চাকসু ক্যাবিনেট অনুযায়ী যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের জন্য তৃতীয় তলার প্রবেশমুখে নির্দিষ্ট একটি রুম বরাদ্দ ছিল, যা ৫ আগস্টের আগ থেকেই নেমপ্লেটসহ ছিল।

তিনি আরও জানান, চাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার শুরুতে স্পষ্টভাবে কে কোন রুমে বসবেন তা নির্ধারণ করে দেননি। কাজের প্রয়োজনে এজিএসকে ছোট রুমের পরিবর্তে মাঝের বড় রুমে দেওয়া হয়েছে, কারণ সেখানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত যাতায়াত থাকে। রুম পুনর্বিন্যাস পুরোপুরি কাজের চাপ ও কার্যক্রমের প্রয়োজন বিবেচনায় করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এদিকে ভর্তি পরীক্ষাকালীন সময়ে চাকসুর বিভিন্ন কার্যক্রমে এজিএসের অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জিএস পক্ষের দাবি, এজিএস মিটিং ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নেননি, ফলে দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে এজিএসের দাবি, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয়েছে এবং অনেক সময় শেষ মুহূর্তে বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য ডাকা হয়। এজিএস জানান, তিনি এ বিষয়ে চাকসু সভাপতিকে অবগত করলেও কোনো প্রতিকার পাননি।

চাকসুর এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অঙ্গন নেত্রী সুমাইয়া শিকদার বলেন, চাকসুর মূল কাজ হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা। তিনি বলেন, বর্তমানে রুম ও চেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

তিনি আরও বলেন, এখনো চাকসুকে কোনো কেন্দ্রীয় বাজেট দেওয়া হয়নি বলে শোনা যাচ্ছে। অথচ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে, যেখানে ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘চিত্রের ঐক্য’-এর প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। ফলে চাকসুর কার্যক্রম কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের অর্থায়নে চলছে কিনা, সে প্রশ্ন উঠছে। তাঁর মতে, চলমান দ্বন্দ্ব মূলত শিবির ও ছাত্রদল সমর্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিফলন।

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়। কিন্তু বর্তমানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসা চাকসুর মতো একটি প্রতিনিধিত্বশীল জায়গার জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবারের চাকসু নির্বাচনে ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতে জয়ী হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘চিত্রের ঐক্য’-এর প্রার্থীরা। সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক। অন্যদিকে ক্রীড়া সম্পাদক পদে জয়ী হয়েছেন বাম রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্যানেল থেকে মাহবুবা প্রীতি।

ক্রীড়া সম্পাদক মাহবুবা প্রীতি বলেন, তিনি চাকসুর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়াতে চান না। তাঁর ভাষায়, তিনি মূলত খেলাধুলা নিয়ে কাজ করছেন এবং মেয়েদের খেলাধুলার উন্নয়ন কীভাবে করা যায় সেটিই তাঁর অগ্রাধিকার। অন্যান্য বিষয়গুলোতে তিনি তেমনভাবে যুক্ত হন না বলেও জানান।

এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, চাকসু থেকে কোনো বিবৃতি গেলে সম্পাদক, ভিপি, জিএস ও এজিএস সবার জানা উচিত। তিনি বলেন, তাঁর মতামত উপেক্ষা করায় তিনি নিজের অবস্থান থেকে স্বাধীনভাবে বিবৃতি দিয়েছেন। রুম বরাদ্দ ও কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতাই এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে জিএস সাইদ বিন হাবিব বলেন, এজিএসের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নেই। তিনি বলেন, এজিএস চাইলে যেকোনো সময় চাকসুর কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারেন। ভর্তি পরীক্ষা ও অন্যান্য কার্যক্রমে তাঁর অনুপস্থিতির কারণেই দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিবৃতি দেওয়ার এখতিয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পদাধিকার বলে চাকসুর প্যাড ব্যবহার করে বিবৃতি দেওয়ার ক্ষমতা কেবল সাধারণ সম্পাদকের।

চাকসুর সহ-সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেন, তিনি উভয় পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছেন। প্রয়োজনে চাকসু সভাপতির উপস্থিতিতে বৈঠক করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, নেতৃত্বের জায়গায় থেকে এভাবে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়ালে স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

চাকসু সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার জানান, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার কারণে বৈঠক কিছুটা পিছিয়েছে। বৈঠকের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

উল্লেখ্য, ১২ জানুয়ারি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দোসর হাসান মোহাম্মদ রোমানের পুনর্বাসন, চাকসু নেতাদের সাইবার বুলিং ও নিয়োগ ইস্যুতে আয়োজিত চাকসুর সংবাদ সম্মেলনেও এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক উপস্থিত ছিলেন না।
 

সম্পর্কিত নিউজ